৪৩৬ কোটি টাকার শেয়ার কারসাজি: তদন্তের জন্য বিএসইসি’কে দুদকের সুপারিশ!

acc-logo_3_54478f0f22eefশেয়ারবাজার রিপোর্ট: শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান ২০১২ সালে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশনর (দুদক)। মাঝখানে প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও অনুসন্ধানের কোন কুল-কিনারা হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে অনুসন্ধানের কাজে ইস্তফা দিয়েছে সংস্থাটি।

‘৪৩৬ কোটি টাকা শেয়ার কারসাজি’ বিষয়ে অনুসন্ধানের কাজে ইস্তফা দিয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর তারিখে দুদক পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে চিঠি দেয়। দুদকের উপ-সচিব ঋত্বিক সাহা স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, শেয়ার কারসাজি করে ৪৩৬ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে জড়িতদের খুঁজতে মানি লন্ডারিং আইন, ২০১২ অনুযায়ী অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিএসইসি’র এখতিয়ার। এদিকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ (সংশোধন) আইন, ২০১৫ অনুযায়ী বিএসইসি’ই তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। তাই চিঠিতে এ বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিএসইসিকে সুপারিশ করেছে দুদক।

এ প্রসঙ্গে দুদকের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে বলেন, দুদক ২০১২ সালের আইন অনুযায়ী শেয়ার কারসাজির বিষয়ে তদন্তের কাজ শুরু করলেও এখন সেখান থেকে সরে এসেছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ (সংশোধন) আইন, ২০১৫ এ দুদকের বাইরে অন্য খাতগুলোর সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা অর্থপাচারসহ অন্যান্য অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্থিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এ প্রসঙ্গে বিএসইসি’র কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর আগে, ২০১২ সেপ্টেম্বর মাসে বহু সমালোচিত শেয়ার কেলেঙ্কারি ঘটনার অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান গোলাম রহমান শেয়ার কেলেঙ্কারি অনুসন্ধানের ঘোষণা দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুদকের ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং আইনের অধীনে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান করা হবে।’এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দেশের ইতিহাসের ভয়াবহ এ শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধানের ঘোষণা দেয়ার পর পাঁচ সদস্যের একটি দল গঠন করেছিল দুদক। এই দলের প্রধান করা হয়েছিল দুদকের উপ-পরিচালক হারুনুর রশিদকে। অপর সদস্যরা ছিলেন- উপসহকারী পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম, মো. হাফিজুর রহমান, রেজাউল হাসান তরফদার ও মফিজুল ইসলাম ভূইয়া।

জানা গেছে, অনুসন্ধান দল বেশ কয়েক দিন এই বিষয় নিয়ে কাজও করেছিলেন। বিএসইসির কাছ থেকে এই অনুসন্ধান কমিটি বেশ কিছু কাগজও সংগ্রহ করেছিল। কিছুদিন পর অজ্ঞাত কারণে তাদের তৎপরতায় ভাটা পড়ে।

উল্লেখ্য, তিনটি মার্চেন্ট ব্যাংকের অমনিবাসের আওতায় ১৯টি বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে এসব কারসাজি ঘটানো হয়। ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১১ সালের ১৫ জুন এ কারসাজি করেন শেয়ার কেলেঙ্কারির হোতারা। এমন অভিযোগ দুদকের কাছে বিভিন্ন সূত্র থেকে করা হয়।

দুদকে আসা অভিযোগে দেখা যায়, এবি ইনভেস্টমেন্ট, প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট ও সাউথ ইস্ট ব্যাংক ক্যাপিটাল সার্ভিসেস লিমিটেডের অমনিবাস হিসাবের মাধ্যমে কারসাজি করে শেয়ারের টাকা তুলে নেন।

দুদক জানায়, কারসাজির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন: লুৎফর রহমান বাদল ও তাঁর স্ত্রী সোমা আলম রহমান; বাদলের স্ত্রীর বড় ভাই আহসান ইমাম ও তাঁর স্ত্রী মেহজাবীন মোস্তফা ইমাম; ইয়াকুব আলী খোন্দকার ও তাঁর মেয়ে সারাহ খোন্দকার; সামরিক কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন ফকির ও তাঁর স্ত্রী রোকসানা আমজাদ; শেয়ার ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা ও তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তার লতা; আওয়ামী লীগ নেতা এইচবিএম ইকবাল ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শেয়ার ব্যবসায়ী মনিরউদ্দিন আহমেদ।

এছাড়া অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান দুটি হলো: নূর আলীর মালিকানাধীন ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস এবং লুৎফর রহমান বাদল মালিকানাধীন নিউ ইংল্যান্ড ইক্যুইটি।

দুদক জানায়, কেলেঙ্কারির হোতারা নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির লেনদেনের প্রথম দিনেই বিধি-বহির্ভূতভাবে ঋণ নিয়েছেন। অথচ আইন অনুসারে, নতুন কোম্পানির লেনদেনের প্রথম ৩০ কার্যদিবসে এর শেয়ার কেনাবেচার জন্য কোনো ধরনের ঋণসুবিধা দেওয়ার বিধান নেই। একইভাবে কেউ কেউ নির্ধারিত মূল্য-আয় (পিই) অনুপাত ছাড়িয়ে অতিমূল্যায়িত শেয়ারে ঋণসুবিধা নিয়েছেন। বেআইনিভাবে এই বাড়তি তারল্য-সুবিধা নিয়ে তাঁরা কারসাজি করেছেন। আবার কেউ কেউ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯-এর ১৭ (ই) ধারা লঙ্ঘন করেছেন।

এসব অপরাধকে দুদক মানি লন্ডারিং অপরাধ হিসেবে দেখছে। তাই এসব অনিয়ম দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে তদন্তে নেমেছিল দুদক।

দুদক জানায়, গত কয়েক বছরে উল্লিখিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা তুলে নেয়।

প্রসঙ্গত, কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাজার তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তিনটি মার্চেন্ট ব্যাংকের অমনিবাসের আওতায় পরিচালিত এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিও হিসাবের অধিকতর তদন্ত করে বিএসইসি। তাতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ আইন ও বিধান লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়।

শেয়ারবাজারনিউজ/আ

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top