শুধুই স্টক ডিভিডেন্ড! এক নির্মম প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়

Editorialপুঁজিবাজারকে বাপের হোটেল মনে করার কোনো সুযোগ আছে কিনা সে প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট স্টোকহোল্ডারদের কাছ থেকেই পাওয়ার আশায় রইলাম। কিছু কোম্পানি নিজেদের তৈরি করা বিপুল পরিমাণ ব্যাংক ঋণের দায় ঘোচাতে বা ব্যবসা বাড়াতে বাজার থেকে টাকা নিয়েছে। অথচ এসব কোম্পানিতে নগদ টাকা বিনিয়োগ করেও বিনিয়োগকারীদের স্টক ডিভিডেন্ডের নামে কাগজ ছাড়া কিছুই মেলেনি। কোম্পানিগুলো যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নিতো তাহলে বছর শেষে সুদের টাকা পুরো হিসেব কষেই দিতে হতো।

কিন্তু পুঁজিবাজারকে তারা টাকার খনি মনে করে যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছে। এখানে তাদেরকে নগদ টাকা পরিশোধের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একেতো শুধুই স্টক ডিভিডেন্ড তারওপর পরিচালকদের সেই বোনাস শেয়ার বিক্রি- মনে হচ্ছে পুরো লুটতরাজের কারখানা এই শেয়ারবাজার। এগুলোর ভবিষ্যত কি?

বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, একটি কোম্পানি যখন কোনো ধরণের এক্সপানশন ছাড়াই শুধু স্টক ডিভিডেন্ড দিতে থাকে তখন সেগুলোতে বিনিয়োগ না করাই ভাল। তারওপর যদি পরিচালকদের বোনাস বিক্রির ঘোষণা থাকে তাইলে তো আর কথাই নেই। এক পর্যায়ে এমন এক পরিস্থিতিতে এসে পৌছায় শুধুমাত্র কাগজ ধরিয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। কারণ কোম্পানির পেইড আপ আর ব্যবসার সাথে কোন ধরণের সংগতি থাকে না।

বেক্সিমকো কোম্পানিটির ইপিএস থাকলেও ১৫ শতাংশ স্টক ধরিয়ে দিবে, আবার কেয়া কসমেটিকস কোম্পানিটি সেই একটি ধারায় চলবে। ইপিএসও থাকা বাঞ্চনীয় নয়! ব্যবসা কি সেটা বড় কথা নয়, ২০ শতাংশ স্টকের নামে কাগজ ধরিয়ে দেয়াটাই যেন সবকিছু। সাইফ পাওয়ার কোম্পানিটি এসে ২৭ শতাংশ স্টক দিয়েই পরিচালকদের বোনাস শেয়ার বিক্রি করল, পরের বছর একইভাবে ২৯ শতাংশ দিয়েই ডাইরেক্টর সেল। তার ওপর দিল এবার রাইট। এরকম ভুড়ি ভুড়ি উদাহরণ রয়েছে।

ফ্যামিলি টেক্স কোম্পানিটি ইপিএস ছাড়াই দিয়েছিল ১০০ শতাংশ স্টক। এর শেয়ার দর ৮০ টাকা থেকে এখন ৮ টাকার ঘরে।

ইউনাইটেড এয়ার এই কোম্পানিটি আইপিওতে পাবলিক থেকে টাকা নিল, তারপর রাইট দিয়ে টাকা তুলল। অথচ এর ইতিহাসে কখনই কিছু দিল না শুধু স্টক ডিভিডেন্ডের নামে কাগজ ধরিয়ে দেয়া ছাড়া। এর পরিচালকরা শুধু লাভবান হল। তাদের কাছে কোন শেয়ার নেই। সব মালিকানা শুধুই পাবলিকের । কিযে এক নির্মম প্রতারণা যা প্রকাশ্যে চলছে।

খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড ২০১৪ সালে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ওই বছর প্রতিষ্ঠানটি বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটি লভ্যাংশ দিতে না পেরে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে আসে। ইমাম বাটন ২০১০ সালে ১০ শতাংশ বোনাস দেয়, যা পরবর্তী সময়ে লভ্যাংশ দিতে না পেরে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থান পায়। মেট্রো স্পিনিং ২০০৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সাত বছর বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে। ২০১৫ সালে ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে আসে প্রতিষ্ঠানটি। আরএন স্পিনিং মিলস ২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে। পরবর্তী বছর থেকে লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে আসে কোম্পানিটি। এমন আরও অনেক প্রতিষ্ঠানই বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার একপর্যায়ে মূল বাজার থেকে সরে পড়েছে। আর এসব কোম্পানির শেয়ার কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

এখন এ বিষয়টি দেখার দায়িত্ব কাউকে দেয়া হয় নাই। কারণ এখনো এ সংক্রান্ত কোনো আইন হয়নি যে লো-পেইড আপের কোম্পানি ছাড়া কোনো কোম্পানি শুধুমাত্র স্টক ডিভিডেন্ড দিতে পারবে না। বছরের বছর পর স্টক ডিভিডেন্ড দিয়ে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফলিওতে শেয়ার যোগ করবে আর নিজেরা বসে বসে ঘি খাবে তা হতে পারে না। বর্তমান পুঁজিবাজারে কোম্পানিগুলো অনেক জবাবদিহিতার আওতায় এসেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এই বিষয়টিও যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সদয় বিবেচনা করেন তাহলেই বোধহয় স্বচ্ছতার শতভাগ পূরণ হয়ে যাবে।

আপনার মন্তব্য

Top