সজিব নিটওয়্যার থেকে যেভাবে আলিফ ইন্ডাষ্ট্রিজ: লুটপাটের স্বর্গরাজ্য

shojibশেয়ারবাজার রিপোর্ট: দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটের একটি কোম্পানি সজিব নিটওয়্যার এন্ড গার্মেন্টস লিমিটেড। যা বর্তমানে ওটিসিতে আলিফ ইন্ডাষ্ট্রিজ নামে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

এক সময়ে বেশ নাম ডাকের সাথে ব্যবসা করা সজীব নিটওয়্যার কিভাবে নিস্তেজ হয়ে গেলো আর কিভাবে সেই কোম্পানি আলিফ ইন্ডাষ্ট্রিজ হয়ে বর্তমানে রমরমা ব্যবসা করে যাচ্ছে সেটাই আজকের অনুসন্ধানের মূল বিষয়বস্তু।

অবাক করার বিষয় হচ্ছে, একদিকে সজীব নিটওয়্যার কোম্পানি নিস্তেজ হয়েছে অন্যদিকে ফুলে ফেঁপে উঠেছে নিজেকে এক সময়ের  দেউলিয়া ঘোষিত করা সজীব নিটওয়্যার চেয়ারম্যানের সম্পদ। আর বিনিয়োগকারীদের ঝুলিতে শুধু লোকসানেই গুনতে হয়েছে। তবে এর পেছনে সংশ্লিষ্টদের তদারকির অভাবকে দায়ী করছে স্থানীয় জনগন।

অভিযোগ উঠেছে, সজিব নিটওয়্যারের প্রাক্তন চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া কোম্পানির বিভিন্ন খাত দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেছেন এবং তার সিংহ ভাগ নিজস্ব একাধিক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছেন। যা ছিল একেবারেই গোপন। এছাড়া শাহজাহান মিয়া বিভিন্ন সময় কোম্পানির নাম দিয়ে মেশিন ক্রয় করেছেন। কিন্তু তার অন্তরালে ছিল অন্যকিছু। মেশিন ক্রয়ের ১০ শতাংশ বা তার কম টাকা খরচ করা হতো মেশিন ক্রয়ের জন্য। বাকি টাকা তিনি কি করতেন তা কেউ জানত না। তবে টাকাগুলো খরচ হিসেবে কাগজে কলমে কোম্পানিরই ছিল।

এর পর অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানির প্রয়োজনে ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লোন নেয়া হয়েছে। সেই সকল লোনের টাকা পরে কোম্পানির ‍ফান্ড থেকে পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু লোনগুলোর খুব কমই কোম্পানির উন্নয়নের কাজে লেগেছে। এর পাশাপাশি কোম্পানিটিকে তিনি দিনে দিনে লোকসানের অতল তলে ডুবিয়ে দিয়েছেন। যার পুরোটাই জানতেন সেই সময়কার কোম্পানি সেক্রেটারী এবং সিএফও।

এক সময় কোম্পানির মাত্র ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকার লোন পরিশোধ করতে না পারায় তা চলে যায় ব্যাংকের হাতে এবং এর দায় থেকে মুক্তি নিয়ে পালাবার পথ খুজে পান শাহজাহান মিয়া। পরবর্তীতে সেই লোন পরিশোধ করে দেয় অন্য একটি গ্রুপ অব কোম্পানি আলিফ গ্রুপ।

এবার একটু পেছনের দিকে তাকানো যাক:

জানা গেছে, সজিব নিটওয়্যারের চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়ার এক সময় কোন ধরনের সম্পদ ছিল না। কোম্পানিটির কারখানা যেখানে অবস্থিত তার পাশের এলাকায় সে থাকতো ভায়েরার বাড়িতে এবং খুব কাছাকাছি তার শশুর বাড়ি। বিভিন্ন জায়গায় ধার করে কোন মতে একটি কোম্পানি দার করান শাহজাহান। পরবর্তীতে ব্যাংকের কাছ থেকে লোন নিয়ে ভাল ভাবেই ব্যবসা চালিয়ে যান তিনি। এর পর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর পরই তাকে ধরে টাকার ভুতে।

সিরাজ নামে সজিব নিটওয়্যারের স্থানীয় একজন প্রাক্তন কর্মচারী বলেন, যেখানে শাহজাহানের একমাত্র সম্পদ এই সজিব নিটওয়্যারের শেয়ার। সেখানে তিনি নাকি রাজধানীর সাভারে একটি অয়েল পাম্প, একটি ইন্ডাস্ট্রি এবং একটি বড় মুরগীর ফার্ম করেছেন। এছাড়া ধানমন্ডির মতো জায়গায় তিনি দুটি বাড়ি করেছেন।

শাহজাহান মিয়া এই সবই করেছেন সজিব নিটওয়্যার থেকে আত্মসাৎ করা টাকা দিয়ে। আর এর পেছনে কারো কোন তদারকি না থাকাকেই দায়ী করেন সিরাজ। কেননা, সে সবাইকে বলেছে মেশিন কিনবে, টাকাও নিয়েছে কিন্তু মেশিন আসেনি। তার দাবি, জিজ্ঞেস করার কেউ না থাকায় দিনের পর দিন শেয়ারবাজারকে ঠকিয়েছে শাহজাহান মিয়া। কারণ কোম্পানির প্রায় অর্ধকোটি টাকারও বেশি সম্পদ থাকার পরও কেন ১২ কোটি টাকার লোন পরিশোধ করতে পারে না। এটা ছিল চেয়ারম্যানের কারসাজি।

এসব বিষয়ের সত্যতা জানতে চাইলে কোম্পানি সচিব আব্দুল হাকিম শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে জানিয়েছেন, আমি এর কিছুই জানি না। এ বিষয়ে তিনিই বলতে পারবেন। তবে শাহজাহান মিয়া আগে থাকতেন ঢাকার গোপীবাগে, এখন কোথায় থাকেন জানি না। শুনেছি তিনি নাকি সাভারে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছেন সেখানেই থাকেন। এখন তার সাথে যোগাযোগের কোন মাধ্যম আমার জানা নাই, মোবাইল নাম্বারও নাই। তৎকালীন সিএফও’র বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তখনকার সময়ের কারো সাথেই আমার কোন যোগাযোগ বা সম্পর্ক নাই।

উল্লেখ্য, উনিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় সজিব নিটওয়্যার এন্ড গার্মেন্টস নামক বস্ত্র খাতের এই কোম্পানি। সজিব নিটওয়্যার ১৯৯৫ সালে তালিকাভুক্তির পর কয়েক বছর কোম্পানিটি ভাল ব্যবসা করে এবং ডিভিডেন্ডও দেয়। এরপর ৮ বছর ধরে লোকসানে থাকা ও ৯ বছর পর্যন্ত ডিভিডেন্ড দেয়নি সজীব নিটওয়্যার। ২০১৪ সালে অবশ্য কোম্পানিটি মূলধন বাড়ানোর অনুমোদন পায়।  এর মাঝখানে নতুন আইনের কারণে কোম্পানিটি ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে চলে যায়। তার পর ২০১৪ ও ২০১৫ সালে কোম্পানিটি আবার আয় দেখায় এবং যথাক্রমে ১০ শতাংশ ক্যাশ ও ১২ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দেয়।

জানা যায়, অব্যাহত লোকসানের কারণে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৯ বছর ধরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি সজিব নিটওয়্যার। লোকসান বাড়তে থাকায় ২০১৩ সালে ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের এ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্য নেমে আসে ৯ টাকা ২৬ পয়সায়। একই বছরে শেয়ার প্রতি লোকসান দাঁড়ায় ২ টাকা ১৪ পয়সায়। ২০১০ সাল থেকে কোম্পানির আয়, সম্পদ ইত্যাদির কোন ডাটা ডিএসই’র ওয়েবসাইটে নাই। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কোম্পানিটি একেবারেই শেয়ারবাজার বিমূখী।

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ থাকা, শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ না দেয়া ও নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা না করাসহ বিভিন্ন কারণে ২০০৯ ও ২০১০ সালে সজিব নিটওয়্যারসহ মোট ৭৯ কোম্পানিকে ওটিসি মার্কেটে স্থানান্তর করে বিএসইসি। এছাড়া সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের কারণে সজিব নিটওয়্যারের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা করে বিএসইসি। তবে ২০১০ সালে সজিব নিটওয়্যার কিনে নেয় আলিফ গ্রুপ। পরে টোকেন পেনাল্টির বিনিময়ে আলিফ গ্রুপের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা প্রত্যাহার করে নেয় কমিশন। প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারের ৪৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তাদের হাতে।

এটি দেশের শেয়ারবাজারে থাকা ওটিসি’র কোম্পানি সজিব নিটওয়্যার নিয়ে একটি অনুসন্ধানী সংবাদের প্রথম পর্ব। পর্যাক্রমে সংবাদটির আরও কয়েকটি পর্ব প্রকাশ করা হবে। দ্বিতীয় পর্বে থাকছে শেয়ারবাজার থেকে চুরির মাধ্যমে করা শাহজাহান মিয়া’র নতুন ব্যবসা এবং তার অবস্থান সম্পর্কে। তারও পরে থাকবে কোম্পানির ৮টি ফ্লোরের মধ্যে মাত্র দুটি ফ্লোরের মাধ্যমে কিভাবে এমন ভাল ইপিএস হয় সেই রহস্য।

শেয়ারবাজারনিউজ/রু/ম.সা

আপনার মন্তব্য

Top