নির্বাচিত হলে ব্যাংক সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনবো-মাতলুব আহমাদ

IMG_20150322_174911বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় প্রতিবন্ধকতা ব্যাংক সুদহার। আল্লাহর মেহেরবানীতে এফবিসিসিআই’র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারলে ব্যাংকের এই সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনবো। আর পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করার ক্ষেত্রে মান্দাতার আমলের ৪০ কোটি টাকার বিনিয়োগ সীমা বাড়িয়ে কম পক্ষে ৪০০ কোটি টাকা করার উদ্যোগ নেবো। আমার বিশ্বাস অনেকগুলো পদক্ষেপের মধ্যে অন্তত এ দুটি কাজও যদি করা সম্ভব হয় দেশ খুব কম সময়ের মধ্যেই শিল্পে সম্মৃদ্ধ হবে এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে এদেশ অচিরেই একটি উন্নত দেশে পরিনত হবে। এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইনডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) এর প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী আবদুল মাতলুব আহমাদ। রাজধানীর মহাখালিস্থ নিটল নিলয় সেন্টারে শেয়ারবাজার নিউজ ডট কমের সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন শেয়ার বাজার নিউজ ডটকমের প্রধান প্রতিবেদক এম এম সানি আহম্মেদ এবং সিনিয়র রিপোর্টার আহসান হাবীব। নিচে সাক্ষাতকারটির চুম্বক অংশ দেয়া হলো:

শেয়ারবাজারনিউজ ডট কম: এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করছেন। পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে কি রকম সাড়া পাচ্ছেন?

আবদুল মাতলুব আহমাদ: আমি ফেডারেশনের সাথে ১৯৮৪ সাল থেকে জড়িত। তাছাড়া ফেডারেশনে দুবার পরিচালক ছিলাম এবং একবার প্রেসিডেন্ট পদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। সে সময় ১০টা সিট পাওয়া সত্ত্বেও নির্বাচিত হতে পারিনি। তবে এবার মনে হচ্ছে পারবো। কারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণার পর সারা দেশ থেকে ভাল সাড়া পাচ্ছি।

শেয়ারবাজারনিউজ ডট কম: এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করছেন। এক্ষেত্রে আপনার পরিকল্পনা কি?

আবদুল মাতলুব আহমাদ: আমি সব সময় ব্যবসায়িদের সমস্যা জানার চেষ্টা করেছি। এর অংশ হিসেবে আমি বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় গিয়েছি। সেখানকার প্রত্যেকটি ব্যবসায়িক সংগঠন বা চেম্বারের মেম্বারদের কাছে তাদের প্রতিবন্ধকতা জানতে চেয়েছি। এমনকি প্রতি সপ্তাহে তিন থেকে চারবার এসব এসোসিয়েশনের মেম্বারদের সাথে মত-বিনিময় সভা করছি। তাদের কাছে ব্যবসায়িদের প্রধান সমস্যার বিষয়ে জানতে চেয়েছি।

শেয়ারবাজারনিউজ ডট কম: বর্তমানে ব্যবসায়িদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা কি?

আবদুল মাতলুব আহমাদ: সবচেয়ে বড় এবং প্রধান সমস্যা অর্থাৎ যেটা সবার মুখে মুখে রয়েছে সেটা হচ্ছে ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার। ব্যাংকগুলো ঋণের বিপরীতে ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। এর আগে ব্যাংকগুলো ২১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিত। যা এখন কিছুটা কমেছে। কিন্তু এখনো সুদের হার ছোট ব্যবসায়িদের সহনিয় পর্যায়ে আসে নাই। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বড় ব্যবসায়িরা কোনমতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারলেও ছোট ব্যবসায়িরা পারছে না। এখানে আমার প্রথম কাজ হলো ছোট বড় সকল ব্যবসায়িদের জন্য ব্যাংকের সুদের হার ৯ শতাংশ হতে হবে। এ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের সাথে কথা বলেছি। এখানে আমি একটা ফর্মুলা তৈরি করেছি। ফর্মুলাটি আমি বাস্তবায়ন করবো। আমি মনে করি এবং বিশ্বাস করি সভাপতি পদে নির্বাচিত হলে ফর্মুলাটির মাধ্যমে মাত্র তিনমাসের মধ্যে ব্যাংক সুদের হার ৯ শতাংশে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। IMG_20150322_175029

শেয়ারবাজারনিউজ ডট কম: রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ লোকসান কাটিয়ে উঠার উপায় কি?

আবদুল মাতলুব আহমাদ: রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসা বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু যে ক্ষতিটা হয়ে যায় সেটা সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা সম্ভব হয় না। যেমন একটা কাঁচের গ্লাস ভেঙ্গে গেলে সেটা আঠা দিয়ে পুনরায় জোড়া লাগানো যায়। কিন্তু জোড়া লাগানো গ্লাস কখনো নতুন গ্লাসের মতো হবে না। ব্যবসাও ঠিক এরকম একটা জিনিস। যদি ব্যবসার কোন ক্ষতি হয়ে যায় তাহলে কোনদিনই এ ক্ষতির সম্পূর্ণ নিরাময় হবে না। এখানে বড়জোর প্রণোদনার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়িকে সাহায্য করা যেতে পারে। সরকার ইতিমধ্যে প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। যেমন বড় ব্যবসায়ির ক্ষেত্রে অর্থাৎ যাদের ৫০০ কোটি টাকার ওপর ঋণ রয়েছে তাদের সুদের হারে ছাড় দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের সময়সীমা, ঋণ শ্রেনিকরণে ছাড় দেয়া হয়েছে। ফলে লোকসানের শিকার হওয়া বড় ব্যবসায়িরা লোকসান কাটাতে মোটামুটি একটা ভারসাম্যপূর্ণ জায়গায় দাঁড়াতে পারছে। ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ও মধ্যম ব্যবসায়িদের ক্ষেত্রেও এ ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন চলমান হরতাল-অবরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ও মধ্যম ব্যবসায়িদের ব্যাংক সুদ সম্পূর্ণ মওকুফ করা যেতে পারে। এখানে সুদ মওকুফ করতে হলে ব্যাংক আপত্তি জানাবে কারণ সেও তো ব্যবসায়ি। সুদ মওকুফের কারণে তাদেরও ক্ষতি হবে। সেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে সরকারের সাথে বসতে হবে। সরকারের কাছ থেকে ব্যাংক ক্ষতির একটা নির্দিষ্ট অংশ ক্ষতিপূরণ নিয়ে নেবে। অপরদিকে হরতাল অবরোধের কারণে যেসব ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ব্যবসায়িরা সময়মত ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারবে না অন্তত ৬মাস তাদের ঋণ শ্রেনিকরণ করা যাবে না। তা না হলে পরবর্তিতে ছোট ব্যবসায়িরা ঋণ খেলাপি হওয়ার দরুণ ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ পাবে না। যা তাদের আরো লোকসানের মুখে ফেলবে। আর সরকারও বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। সে অনুযায়ী সরকার সুযোগও দিচ্ছে। এখন আমাদের সে সুযোগগুলো ব্যবহার করতে হবে। এ বিষয়ে এফবিসিসিআই যথাযথ ভূমিকা পালন করবে।

শেয়ারবাজারনিউজ ডট কম: ব্যবসা বান্ধব মূসক নির্ধারণ নিয়ে সরকারের কাছে ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনটিই আলোর মুখ দেখেনি। এ বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা কি?

আবদুল মাতলুব আহমাদ: মূল্য সংযোজন কর (মূসক) থেকে সরকার সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় করে। কিন্তু এখানে সরকার সবার জন্য ১৫ শতাংশ মূসক নির্ধারণের কথা বলছে। এখানে এফবিসিসিআই বলছে, সবার জন্য ১৫ শতাংশ না করে ধরণ বুঝে বিভিন্ন সংখ্যার মূসক নির্ধারণ করার জন্য। এখানে আমার প্রস্তাব হচ্ছে সবার জন্য অভিন্ন মূসক। সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার মতো সবার জন্য ৪ শতাংশ হারে মূসক নির্ধারণ। এ ক্ষেত্রে কি হবে-সবার মাঝে মূসক ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা কমে যাবে। পাশাপাশি সরকারও মূসক থেকে আগের তুলনায় অনেক বেশি রাজস্ব আয় করতে পারবে। এর জন্য সভাপতি নির্বাচিত হলে আমি সরকারের কাছে সিঙ্গেল ডিজিটের মূসক নির্ধারণের প্রস্তাব করবো। পাশাপাশি আমি যে মূসক দেবো এ বিষয়ে সরকার কোন প্রশ্ন করতে পারবে না। আর আমি যদি মূসক না দেই তবে সরকারকে বলবো পাঁচগুণ জরিমানা করার জন্য। মূসক দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হলে মানুষ নিজ থেকেই মূসক পরিশোধ করবে। মূসক আদায়ের জন্য সরকারের এতো জনবলের প্রয়োজন হবে না। আর ৪ শতাংশ মূসক ফাঁকি দেওয়ার জন্য মানুষ ৩ শতাংশ ঘুষ গুনবে না।

শেয়ারবাজারনিউজ ডট কম: আপনি ভারতের টাটা কোম্পানির সাথে যৌথভাবে ব্যবসা করছেন। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন কি?

আবদুল মাতলুব আহমাদ: ভারতের সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক ১৯৭৪ সালে যেমন ছিল বর্তমানে সম্পর্কটা ওই পর্যায়ে আবার ফিরে এসছে। ব্যবসার ক্ষেত্রেও ভারত পূর্বের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশকে অনেক বেশি ছাড় দিচ্ছে। যেমন ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় ভারতে পণ্য রপ্তানি করছে। কিন্তু ভারতকে শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করতে হয়। পৃথিবীর কোথাও এ ধরণের ওয়ান-ওয়ে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য নেই। আমাদের দেশের জন্য এটা বেশ বড় সুযোগ। কিন্তু এখানে আমাদেরকে শুধুমাত্র পোষাক শিল্পের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। আমাদেরকে রপ্তানিযোগ্য পণ্য বাড়াতে হবে। শুধু তাই নয় ভারত থেকে যেসব পণ্য আমাদের দেশে আসছে সেটা এখানেই উৎপন্ন করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে উৎপাদিত পণ্য ভারতসহ বিশ্বের অন্য দেশগুলোতেও বিক্রি করবে। এ প্রক্রিয়া বর্তমানে শুরুও হয়েছে। যেমন টাটা, ম্যারিকো, হিরো, সান ফার্মা ইত্যাদি কোম্পানিগুলো এদেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। এছাড়া এ জাতীয় অন্য কোম্পানিগুলোও এদেশে বিনিয়োগ করতে কিংবা তাদের কার্যক্রম শুরু করতে আগ্রহী।

শেয়ারবাজারনিউজ ডট কম: বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় আইনে কোন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি? থাকলে এ বিষয়ে আপনার প্রস্তাব কি?

আবদুল মাতলুব আহমাদ: এখানে একটি সমস্যা আছে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ আইন অনুযায়ী ৪০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হলে একে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করতে হবে। এটা খুব বড় একটি সমস্যা। কারণ বড় কোম্পানিগুলো যারা হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তাদের কাছে ৪০ কোটি টাকা কোনো টাকাই নয়। আবার দেখা যায়, এসব কোম্পানি শত কোটি টাকার কমে বিনিয়োগ করতে পারে না কিংবা করে না। যার জন্য এ বিনিয়োগ সীমা ৪০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০০ কোটি কিংবা ৫০০ কোটি টাকা না করা হয় তাহলে যৌথ উদ্যোগে বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি আসবে না। এক্ষেত্রে তারা ছোট ছোট বিনিয়োগ করবে। স্বল্প মূল্যের পণ্য তৈরিতে বিনিয়োগ করবে। কিন্তু গাড়ি কিংবা মটরসাইকেল কিংবা বড় ইন্ডাস্ট্রি গড়তে পারবে না। কারণ পাবলিক এতো বড় বিনিয়োগে অংশ নেবে না। তাই আমাদের দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ৪০ কোটি টাকার যে সীমা দেওয়া আছে সেটাকে বাড়িয়ে ৪০০ কোটি টাকা করতে হবে। কারণ সময়ের পরিবর্তনের সাথে বিশ্ব-ব্যাপি বিনিয়োগের হারেরও পরিবর্তন ঘটেছে। আর আমাদের আইনটি ৩০ থেকে ৪০ বছর আগে করা। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব এ নিয়ম পরিবর্তন করে যুগপোযোগী করতে হবে। তা না হলে আমরা বড় বিনিয়োগকারীদের এদেশে বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করতে পারবো না।

 

শেয়ারবাজার/তু/সা/শা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top