মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করে ব্যবসা করছে সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ

shuridশেয়ারবাজার রিপোর্ট: এক রকম আইনের তোয়াক্কা না করেই ব্যবসা পরিচালনা করছে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। আইন অনুযায়ী উৎপাদন সংক্রান্ত যে কোন তথ্য মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে সংশ্লিষ্ট সকলের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের যথা সম্ভব দ্রুত জানাতে হবে।

সম্প্রতি প্রকৌশল খাতের এ কোম্পানি নতুন দুটি পণ্যের উৎপাদন কাজ শুরু করেছে এবং এর মাধ্যমে লোকসান থেকে মুনাফায় ফেরার আশা করছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। যা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হয়েও সবার কাছে গোপন। আর অভিযোগ উঠেছে, এ গোপন তথ্যের মাধ্যমে শেয়ারে কারসাজি করে একটি শ্রেণী সুবিধা নিচ্ছে আর তাতে সহায়তা করছে কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা। ফলাফল হিসেবে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

উল্লেখ্য, দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ১৯৯৩ (১৯৯৩ সালের ১৫নং আইন) এর ২৫ ধারা (ঘ) এর উপধারা (উ)তে বলা আছে কোম্পানির বিএমআরই বা নতুন ইউনিট স্থাপন সংক্রান্ত যে কোন তথ্য মূল্য সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হবে।

একই বিষয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত এক গেজেটে বলা আছে, স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত প্রতিটি সিকিউরিটি ইস্যুকারী উহার কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ৩০ মিনিটের মধ্যে কিংবা তথ্যটি উহার গোচরে আসার তারিখেই তাৎক্ষনিকভাবে উহার চেয়ারম্যান,প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা কোম্পানি সচিব এর স্বাক্ষরে লিখিতভাবে একই সাথে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জে (যদি উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত থাকে তবে একই সাথে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে) এর নিকট ফ্যাক্স ও বিশেষ বার্তাবাহক মারফত,ক্ষেত্রবিশেষে কুরিয়ার সার্ভিসযোগে প্রেরণ করিবে এবং উক্ত তথ্য বহুল প্রচারিত দুইটি দৈনিক পত্রিকায় (একটি বাংলা ও অপরটি ইংরেজি) ও একটি অনলাইন পত্রিকায় অবিলম্বে প্রকাশনা নিশ্চিত করবে। সেখানে এও বলা আছে, উল্লেখিত আদেশ অমান্য করা বিএসইসি আইন ১৯৯৩ মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

একদিকে, বিগত বছরের তুলনায় কোম্পানির উৎপাদন অনেকটাই কমে যায়। ২০১৪ সালে কোম্পানিটি উৎপাদনের জন্য ১৫ কোটি ৯৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩১ টাকা ব্যয় করে এবং

২০১৫ সালে তা ৫ কোটি ৮৭ হাজার ৫৮৮ টাকা কমিয়ে দেয়। এ সময় কোম্পানির উৎপাদনে ব্যয় হয় ১০ কোটি ৯২ লাখ ৯০ হাজার ৩৪৩ টাকা।

অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড না দিতে পারলেও নতুন দুটি পণ্যের উৎপাদন কাজ শুরু করেছে কোম্পানিটি যা এখনো সংশ্লিষ্ট কাউকে এবং বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়নি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে পিভিসি পাইপ।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি। তবে পাওয়া গেছে এস কে সাহা নামে কোম্পানির সচিবকে। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানি সচিব এস কে সাহা বলেন, যেখানে আমাদের ফ্যাক্টরি অবস্থিত সেখানে বিদ্যুৎ এর অনেক সংকট রয়েছে। যার জন্য আমরা ডিজেল এর মাধ্যমে জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আর এতে কোম্পানির অনেক টাকা ব্যয় হয় তাই উৎপাদনও কমে যায়। তবে বিদ্যুৎ ঠিকমত দেওয়ার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রনালয় চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা সাড়া পাচ্ছি। আর আমরা নতুন ২টি উৎপাদন কাজ করছি। কিন্তু তা এখনো বাজারে ছাড়িনি। বর্তমানে তার পরীক্ষামূক উৎপাদন চলছে। এর পর তা সম্প্রসারণ হওয়ার পরই তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার মাধ্যমে সবাইকে জানানো হবে। আর এর মাধ্যমে আগামী বছরে কোম্পানিটি মুনাফায় ফিরবে বলে আশা করি।

উল্লেখ্য, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ১৪ কোটি টাকা উত্তোলন করে ২০১৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় প্রকৌশল খাতের সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কিন্তু তালিকাভুক্তির প্রথম বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্টক ডিভিডেন্ড নামক কাগজ ধরিয়ে দিলেও পরের বছরেই বিনিয়োগকারীদের হতাশ করে এ কোম্পানিটি। এমনকি ওই বছরে কোম্পানিটি মুনাফা থেকে লোকসানে চলে যায়। আর এ জন্য কোম্পানির চেয়ারম্যানই দায়ী এমনটাই অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের ।

বিনিয়োগকারীদের মতে, ২০১৫ সালে কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে আনিস আহমেদ যোগদান করার পর থেকেই কোম্পানিটি লোকসানে রয়েছে। কোম্পানির প্রতি বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই কোনো কারণে তা লাভের মুখ দেখছেনা। যার ফলে এর মাসুল দিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

এস কে সাহা এর সাদামাটা উত্তরে শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে জানান, আসলে এ কোম্পানির চেয়ারম্যান কোন সময় পরিবর্তন করা হয়নি। কোম্পানির শুরু থেকেই আনিস আহমেদই কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে পরিচালনা পর্ষদ চেয়ারম্যানের বয়স বেশি নিয়ে অভিযোগ করেন। এমনকি বিষয়টি নিয়ে দ্বন্ধ শুরু হওয়ায় তা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। তবে শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় আনিস আহমেদের পক্ষেই হয়।

২০১৪ সালে কোম্পানিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্য ১ কোটি ৪০ লাখ শেয়ার ইস্যু করে ১৪ কোটি টাকা উত্তোলন করে। উত্তোলিত টাকা দিয়ে কোম্পানিটি ৪ কোটি ৩৭ লাখ দিয়ে ঋণ পরিশোধ, ১ কোটি ৮৫ লাখ দিয়ে ভবন সম্প্রসারণ, ৩ কোটি ৪১ লাখ দিয়ে প্লান্ট ও মেশিনারি ক্রয়, ৩ কোটি ৩১ লাখ দিয়ে গ্যাস জেনারেটর ক্রয় ও বাকি ১ কোটি ৪ লাখ দিয়ে আইপিও ব্যয় করে। এদিকে বিএসইসি’র আইপিও আইন অনুযায়ী আইপিও’র মাধ্যমে আসা কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকের শেয়ার তালিকাভুক্তির পরবর্তী তিন বছরের জন্য লক-ইন থাকবে। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে কোন শেয়ার বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু স্টক ডিভিডেন্ড থেকে প্রাপ্ত শেয়ার বিক্রিতে কোন নিষেধাজ্ঞা ছিল না। আর এ নিয়ে বিভিন্ন মহলের ব্যাপক সমালোচনা থাকায় ২০১৬ সালের শুরুর দিকে বিএসইসি তালিকাভুক্তির পরে স্টক ডিভিডেন্ড থেকে প্রাপ্ত শেয়ার বিক্রিতে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের জন্য দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

এদিকে, তালিকাভুক্ত হওয়ার পর কোম্পানিটি ১৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষনা করে। এরপরের বছরেই অর্থাৎ ২০১৫ সালের ৩০ জুনে সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটি নো ডিভিডেন্ড দিয়ে বিনিয়োগকারীদের হতাশ করে। এছাড়া কোম্পানটি সমাপ্ত অর্থবছরে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা লোকসানও দেয়।  আলোচিত সময়ে কোম্পানির শেয়ার প্রতি লোকসানের পরিমাণ দাড়ায় ০.০৩ টাকায়।  আর এ কারণেই ৩০ জুন ২০১৬ সালের সমাপ্ত হিসাব বছরেরও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ দেয়নি প্রকৌশল খাতের এ কোম্পানিটি। এ সময় কোম্পানি শেয়ার প্রতি  লোকসান বেড়ে দাড়ায় ০.০৪ টাকায়। আর এ সব কারণে কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালক বিপুল পরিমাণ অর্থ পুঁজিবাজার থেকে বের করে নেয়।

২০১১ সালের ২২ নভেম্বর বিএসইসির ধারা ২সিসি অর্পিত ক্ষমতাবলে অধ্যাদেশ, ১৯৬৯ (১৯৬৯ এর xvii) প্রজ্ঞাপন জারিতে বলা হয় পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্য-বাধকতা পূরণ করতে হবে। তারপরেও কোম্পানিটি তা পরিপালন না করে ব্যবসা করছে।

তাছাড়া কোম্পানিটি আইপিও আবেদন করার আগে প্রাইভেট প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানির মূলধন বৃদ্ধি করেছে বলে জানা গেছে। আইপিও আবেদন করার আগে কোম্পানিটি ২৪৫ জনের কাছে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট মোট ২৪ কোটি ৩৪ লাখ ৭১ হাজার ১০০ টাকার শেয়ার বিক্রি করে মূলধন বৃদ্ধি করে। এর আগে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারদের মোট শেয়ারের মূল্য ছিল ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

যার কারণে কোম্পানিটি আবেদেনের আগে ২৮ কোটি টাকা লেনদেন দেখায়। কিন্তু যখনই কোম্পানিটি আইপিও’র অনুমোদন পায় সাথে সাথে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকগণ তাদের হাতে থাকা শেয়ার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তালিকাভুক্ত হওয়ার দুই বছরের মধ্যে যা ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসে যা বিএসইসির আইন লঙ্ঘন।

২০১৪ সালে প্রকাশিত প্রসপেক্টাসে কোম্পানিটির ৯ জন উদ্যোক্তা ও পরিচালকের তালিকা দেয়া হয়েছে। যাদের শেয়ার তিন বছরের জন্য লক-ইন থাকবে। ২০১৪ সালে মোট ১৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দেয়। আর এ নিয়ে অনেকেই শেয়ার বিক্রয় করে কোম্পানি থেকে সরে যায়। কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের যে কোন শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে ঘোষণা দিতে হয়। কিন্তু কোম্পানির কোন উদ্যোক্তা ও পরিচালক ঘোষণা না দিয়েই শেয়ার বিক্রির করে দেয়।

৩০ জুন, ২০১৫ হিসাব বছর শেষে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকের কাছে মোট ৩২.৬২ শতাংশ শেয়ার ছিল। একই সময়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ছিল ৬৭.৩৮ শতাংশ। কিন্তু ৩১ অক্টোবর, ২০১৬ তারিখ পর্যন্ত কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকের শেয়ারধারন ৯.৪১ শতাংশে নেমে গেছে।

ডিএসই সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে কোম্পানিটি ৫ কোটি ১৩ লাখ মুনাফা করেছে। কিন্তু পরের বছরেই কোম্পানিটি লোকসানে বিরাজ করে। ২০১৫ সালে কোম্পানিটি ১৭ লাখ টাকা লোকসান হয়। আর ২০১৬ সালে কোম্পানির লোকসান হয় ২০ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে এস কে সাহা শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে জানান, ২০১৪ সালে নির্দিষ্ট সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত করতে না পারায় কোম্পানির এলসি আটকে যায়। এমনকি প্রায় ৮ মাস এলসি বন্ধ থাকায় ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়াতে পিভিসি উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যায়। এ জন্য অনেক গ্রাহককে ঠিকমত করে পন্য সরবরাহ করা যায়নি। যার জন্য কোম্পানির অনেক লোকসান হয়।

তছাড়া উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় মেশিনগুলোতে মরিচা পরে এবং মেইন ডিসি মোটর নষ্ট হয়ে যায়। বিদেশ থেকে কিছু পার্টস আমদানি করতে হয়। এতে কোম্পানির ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। তাই গত ২ বছর ধরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ডে দিকে পারছে না।

সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর’১৬) কোম্পানিটি লোকসান থেকে মুনাফায় ফিরেছে। প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ০.০১ টাকা। যা আগের বছর একই সময় ছিল ০.০১ টাকা (নেগেটিভ)।

শেয়ারবাজারনিউজ/এম.আর/রু

আপনার মন্তব্য

Top