পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান-পরিচালকের জালিয়াতি ফাঁস: আদালতের অব্যাহতি

pubali

পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান এবং পরিচালক কবিরুজ্জাম ইয়াকুব

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকিং খাতের পূবালী ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান এবং পরিচালক কবিরুজ্জামান ইয়াকুবের অর্থ কেলেঙ্কারির জালিয়াতি ফাঁস হয়ে গেছে। ব্যাংকের এ দুই পরিচালক অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর নামে বেআইনীভাবে ঋণ মঞ্জুর, রি-সিডিউল, সুদ মওফুকসহ যাবতীয় অনৈতিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আর তাদের এসব অনিয়মের চিত্র তুলে আদালতে রিট দাখিল করেন ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডার মো: আব্দুল আওয়াল এবং আমানতদার মো: রাফাতুল ইসলাম। তাদের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মোঃ আসফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোঃ খসরুজ্জামান এর দ্বৈত বেঞ্চ ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ও পরিচালক কবিরুজ্জামান ইয়াকুবকে পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম হতে অব্যাহতি প্রদান করেছেন।

সেই সঙ্গে  সাথে পূবালী ব্যাংক কর্তৃক চন্দ্রা স্পিনিং মিলের নামে মঞ্জুরকৃত রি-সিডিউল ওভারডিউ এবং আউটস্টান্ডিং টার্ম লোন এবং ট্রাস্ট রিসিপ্ট এর বিপরীতে লোন (LAT) ফ্যাসিলিটিস প্রত্যাখ্যান/প্রত্যাহার করা জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্দেশ প্রদান করেন।

এ বিষয়ে রিটকারী মো: আব্দুল আওয়াল শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে জানান, পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক মিলে অবৈধভাবে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে নানা অপকর্ম করেছে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ দাখিল করেছি। কিন্তু কোথাও কোনো সুরাহা না হওয়ায় আমরা আদালতের শরনাপন্ন হয়েছি। আদালত তাদেরকে অব্যাহতি দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, গতকাল পূবালী ব্যাংকের নিয়মিত বোর্ডসভা ছিল। সেখানে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। আদালতের নোটিশ আসার পর তারা বোর্ডসভা থেকে বেরিয়ে পড়েন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, পূবালী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ও পরিচালক জনাব কবিরুজ্জামান ইয়াকুব অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর নামে বেআইনীভাবে ঋণ মঞ্জুর, রি-সিডিউল, সুদ মওফুকসহ যাবতীয় অনৈতিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করে আসছেন। বর্তমানে ১০০ কোটি টাকার লিমিট উপভোগ করছেন এবং বছরের পর বছর বে-আইনীভাবে সুদ মওফুকের সুযোগ গ্রহণ করে আসছেন।

হাবিবুর রহমান পূবালী ব্যাংকের পরিচালক থাকা অবস্থায় চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর উদ্যোক্তা পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পূবালী ব্যাংকের নিকট হতে চন্দ্রা স্পিনিং মিলের নামে প্রভাব খাটিয়ে মোটা অংকের ঋণ গ্রহণ করেন। বিভিন্ন সময় লোন ক্লাসিফাইড হওয়া সত্বেও এদের অবৈধ প্রভাবে ক্লাসিফাইড ঘোষণা করা হয় নাই।

সর্বশেষ গত ১৫ নভেম্বর পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ১০৯২তম সভায় কোন ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই চন্দ্রা স্পিনিং মিলের লোন রি-সিডিউল করে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে সৎ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা তথা পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে এক ভয়াবহ আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এদিকে পূবালী ব্যাংকের অপর পরিচালক কবিরুজ্জামান ইয়াকুবও প্রথমে চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর পরিচালক এবং বর্তমান নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা পর্ষদে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে কোম্পানী আইন, ১৯৯৪; ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ ও বিআরপিডি সার্কুলার অমান্য করে এই সকল অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন।

উল্লেখ্য , ব্যাংক অফিসিয়ালদের ধারনা এই দুই ব্যাক্তি বিগত ২৬ বছর ধরে বিভিন্ন কৌশলে পূবালী ব্যাংক হইতে কমপক্ষে ১০০ (একশত) কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
কবিরুজ্জামান ইয়াকুব একদিকে চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর নির্বাহী পরিচালক অপরদিকে পূবালী ব্যাংকের পরিচালক। তিনি ৩০/০৬/১৯৯৮ তারিখে ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ এর ২৭ক ধারা লঙ্ঘন করে পূবালী ব্যাংকের পরিচলনা পর্ষদের অনুমতি ব্যতিরেকে চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর শেয়ার হস্তান্তর করেন। যদিও তিনি চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর শেয়ার হস্তান্তর করেছেন কিন্তু তিনি অত্যান্ত সুকৌশলে প্রথমে আইচ (বিডি) লিমিটেডের নামে একটি কোম্পানীর নিকট প্রতিটি ১০০/- টাকা অভিহিত মূল্যের ৪,৪৫,৬১৭টি (৪১.৮%) শেয়ার ইস্যু করেন যা এককভাবে চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর সর্বোচ্চ শেয়ার।

আবার দেখা যায় যে, আইচ (বিডি) লিমিটেডের প্রতিটি ১০০/- টাকা অভিহিত মূল্যের ১,৩০,৬৪০টি শেয়ার ইস্যু করা হয় ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমার্সিয়াল এন্টারপ্রাইজ লিঃ নামক মরিশাসের একটি অফসর (Offshore) কোম্পানীর নামে যার ঠিকানা হচ্ছে, হ্যাপি ওয়াল্ড হাউজ (৭ ফ্লোর), স্যার উইলিয়াম নিউটন রোড, পোর্ট লুইস, রিপাবলিক অব মরিশাস।

আর মরিশাসের এই কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এম. কবিরুজ্জামান। অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে,অত্যান্ত সুকৌশলে কবিরুজ্জামান ইয়াকুব প্রথমে চন্দ্রার শেয়ার আইচ (বিডি) কে আবার আইচ (বিডি)র শেয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমার্সিয়াল এন্টারপ্রাইজকে ইস্যু করে সর্বশেষ নিজে তার রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর মালিকানা নিজের নিয়ন্ত্রনে রেখেছেন। যে কারণে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং এর অভিযোগও উত্থাপিত হচ্ছে।

অন্যদিকে পূবালী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান পূবালী ব্যাংকের পরিচালক থাকা অবস্থায় চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর উদ্যোক্তা পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। যখন চন্দ্রা স্পিনিং মিলস পূবালী ব্যাংকের ঋণখেলাপি হয় তখন তিনিও ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ এর ২৭ক ধারা লঙ্ঘন করে পূবালী ব্যাংকের পরিচলনা পর্ষদের অনুমতি ছাড়া ০৬/০৬/১৯৯৮ তারিখে তার ধারণকৃত চন্দ্রা স্পিনিং মিলস এর ৬,০০০ হাজার শেয়ার মনিরুদ্দিন, ঠিকানা- হাউজ নং ৩, রোড নং ৮৪, গুলশান-২ ঢাকা এর নিকট হস্তান্তর করেন এবং এই মনিরুদ্দিনকে বর্তমানে চন্দ্রা স্পিনিং মিলের পরিচালক হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

খবর নিয়ে জানা গেছে, এই বাড়িটির মালিক ছিলেন হাবিবুর রহমান যা বর্তমানে তিনি তার ছেলে মেসবাহ দিলওয়ার রহমানের নিকট হস্তান্তর করেছেন। কিন্তু এই বাড়িটিতে বর্তমানে “গ্রীন ডেল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল” নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। তবে মনিরুদ্দিন নামের কোন ব্যক্তি এই বাড়িতে বসবাস করেন না। এই মনিরুদ্দিন কোন আয়কর রিটার্ণ দাখিল করেন না। ধারনা করা হচ্ছে যে, এই হাবিবুর রহমান তার ৬,০০০ শেয়ার মনিরুদ্দিনের নামে বে-নামীতে রেখেছেন।

এই সকল অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে রিটকারী মো: আব্দুল আওয়াল এবং মো: রাফাতুল ইসলাম গত ০৭ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার বিআরপিডি বরাবরে অভিযোগ করেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার না পেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। গত ২৯/২২/২০১৬ তারিখে শুনানীর পর আদালত সন্তুষ্ট হয়ে রুল এবং স্টে প্রদান করেন। উক্ত শুনানী পরিচালনা করেন বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ।

এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও অভিযুক্ত পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কেউ রাজি হননি। এছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও ব্যর্থ হতে হয়। ব্যাংকটির ডিজিএম আব্দুল হাই শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে জানান, আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখনো আমরা কিছু জানি না। এ বিষয়ে এমডি সাহেব কিছু বলতে পারবেন না।

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top