কি হচ্ছে ঢাকা ডায়িংয়ে? ক্রমাগতই ঠকে যাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

dacca_dayingশেয়ারবাজার রিপোর্ট: ব্যবসা সস্প্রসারণের নামে অনেক কোম্পানি দেশের শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু তালিকাভুক্তির পরপরই বছরের পর বছর লোকসান দেখাচ্ছে কতিপয় কোম্পানি। ফলে এই লোকসানের দায়ভার বহন করতে হয় বিনিয়োগকারীদের।

জানা যায়, তালিকাভুক্তির আগে আইপিও’তে আসার সময় বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ধরনের মুনাফা সংক্রান্ত লোভ দেখায় কোম্পানিগুলো। এরপর তালিকাভুক্ত হয়ে দিনের পর দিন তারা বিনিয়োগকারীদের ঠকিয়ে যায়। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এমন কোম্পানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তেমনি একটি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের দ্যা ঢাকা ডাইং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড।

অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানিটি আইপিও’র মাধ্যমে ব্যবসা সস্প্রসারণের নামে টাকা উত্তোলন করলেও সে টাকা এখনো ব্যবহার করেনি। বরং তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক অবস্থা অনেকটাই তলানিতে অবস্থান করছে। এমনকি যন্ত্রপাতি ক্রয়, পণ্যের বহুমুখীকরণ, মূলধন যোগান, বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ ইত্যাদি কাজের কারণে রাইট শেয়ার ছাড়বে বলে কোম্পানিটি মুনাফা দেখিয়েছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি বিষয়টি নাকচ করে দিলেই কোম্পানির মুনাফা ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং এক সময় লোকসানের কোলে ঢলে পড়ে।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সাথে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তারা ব্যস্ততা দেখিয়ে কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি। এমনকি সরাসরি কোম্পানিতে গিয়ে সেক্রেটারি কিংবা এমডি মহোদয়ের সাথে কথা বলতে চাইলেও ব্যস্ততা দেখিয়ে কেউ দেখা করেননি। তবে পরিচয় না দিয়ে কোম্পানির একজন সিনিয়র অফিসার বলেন, আসলে কোম্পানির যদি লাভ হয় তাহলে কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিবে। লাভ না হলে কোথা থেকে লভ্যাংশ দিবে?

তবে ধারাবাহিকভাবে কোম্পানির মুনাফা কমতে কমতে লোকসানে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। কোম্পানির সেক্রেটারির সাথে কথা বলতে হবে।

আইপিও’তে আসার সময় কোম্পানির প্রসপেক্টাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় দ্যা ঢাকা ডাইং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড। সে সময় আইপিও’র মাধ্যমে ১০ টাকা ইস্যু মূল্যে ১৭ কোটি টাকা উত্তোলন করে কোম্পানিটি। উত্তোলিত অর্থের ১২ কোটি ৪৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা অ্যাক্যুইজিশন অব প্লান্ট অ্যান্ড মেশিনারিজের (যন্ত্রপাতি সংস্থাপন) কাজে ব্যয় করে। ৪ কোটি টাকা ওয়ার্কিং ক্যাপিট্যাল হিসাবে ব্যয় ও বাদবাকি অর্থ অর্থ্যাৎ ৫৬ লাখ ৭৫ টাকায় আইপিওতে ব্যয় করে বলে জানা যায়।

এক বিশ্লেষনে দেখা যায়, গত ৬ বছরের মধ্যে ২০১১ সালে কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় হয়েছে ১.৬১ টাকা এবং ১৬ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে, ২০১২ সালে ইপিএস ১.২১ টাকা এবং ১২ শতাংশ স্টক, ২০১৩ সালে ইপিএস ১.০২ টাকা এবং ১০ শতাংশ স্টক, ২০১৪ সালে ইপিএস ১.০২ এবং ১০ শতাংশ স্টক। তবে ২০১৫ সালে ১.০৯ টাকা ইপিএস বৃদ্ধি পেলেও পরের বছর আরো তলানিতে চলে যায়। ২০১৬ সালে কোম্পানিটি লোকসানে চলে যায়। ওই বছর কোম্পানিটি লোকসান হয় ৩.৩০ টাকা এবং ‘নো ডিভিডেন্ড’ ঘোষণা করে।

এখানে কয়েকটি প্রতিপাদ্য বিষয় রয়েছে যার মধ্যে গত ৬ বছরে কোম্পানির ইপিএস টানা কমেছে, এ সময়ে কোম্পানির শুধু স্টক ডিভিডেন্ড দেয়ার প্রবণতা এবং সর্বশেষ অর্থ বছরে ইপিএসে ধ্বস নেমেছে।

আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় এই ৬ বছরের মধ্যে ২০১১ সালে কোম্পানি্ ইপিএস করেছে ১.৬১ টাকা এবং ১৬ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের দিয়েছে ১.৬০ টাকা, একই ভাবে ২০১২ সালে ইপিএস ২.২১ টাকা এবং ১.২০ টাকা, ২০১৩ সালে ইপিএস ১.০২ টাকা এবং ১ টাকা, ২০১৪ সালে ইপিএস ১.০২ এবং ১ টাকা, ২০১৫ সালে ১.০৯ টাকা ইপিএস এবং ১ টাকা, আর সর্বশেষ ২০১৬ সালে কোম্পানিটি লোকসান করেছে  ৩.৩০ টাকা এবং বিনিয়োগকারীদের ‘নো ডিভিডেন্ড’ ঘোষণা করেছে।

আবার প্রসপেক্টাসের ১৫নং পৃষ্ঠায় বলা আছে, আইপিওর মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ ব্যবহার শেষে কোম্পানিটির ডাইং ও প্রিন্টিং ইউনিটের লাইসেন্সড ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। তালিকাভুক্তির সময় ঢাকা ডাইংয়ের ডাইং ইউনিটের লাইসেন্সড ক্যাপাসিটি ছিল ২ কোটি ৭০ লাখ ইয়ার্ড। যা আইপিও’র অর্থ ব্যবহারের পর ৩ কোটি ৭০ লাখ ইয়ার্ড হওয়ার কথা।

এদিকে, প্রিন্টিং ইউনিটের ধারণ ক্ষমতাও একই পরিমান অর্থাৎ ১ কোটি ইয়ার্ড বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু ২০১৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোন সেকশনেই এখন পর্যন্ত কোম্পানিটির লাইসেন্সড ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি পায়নি। বরং প্রডাকশন ক্যাপাসিটি হ্রাস পেয়েছে।

কোম্পানিটি ২০০৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে এর অনুমোদিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা ও পরিশোধিত মূলধন ৭৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। রিজার্ভের পরিমাণ ১১২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। মোট শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালক ৩০ দশমিক ২৩ শতাংশ, ২২ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও দশমিক ৪৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে।

শেয়ারবাজারনিউজ/এম.আর/মা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top