কোথায় ঠেকছে ওয়েস্টার্ন মেরিনের ভবিষ্যত?

westarinশেয়ারবাজার রিপোর্ট: দুই বছর ধরে এজিএম অনুষ্ঠান এবং আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত  ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড। মামলা জটিলতা কারণে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির ডিভিডেন্ড থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় কোম্পানির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারছেন না ভুক্তভোগিরা। যে কারণে কোম্পানির ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে ঠেকছে এমন সংশয় বিরাজ করছে।

তবে কোম্পানি বলছে শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে। তারা কোম্পানির এজিএম এর জন্য অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেছে। শুনানির পর আবেদনটি মঞ্জুর হলে যেকোন সময় এর সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, শেয়ারবাজারে ২০১৪ সালে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি ওয়েস্টার্ন মেরিনের শিপইয়ার্ডের মোট শেয়ারের পরিমান ১২ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার ৯০টি। এর মধ্যে ৩৭.৩১ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তা পরিচালক, ১৪.৯৩ শতাংশ শেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক এবং ৪৭.৭৬ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।হতাশার পিছনে যেসব কারণ ও আইনের খেলাপ রয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হল:

আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ: কোম্পানিটি সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১৪ মে তাদের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর পর আড়াই বছর পাড় হয়ে গেলেও কোন ধরনের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। যার মাধ্যমে কোম্পানিটি সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত একাধিক আইন ভঙ্গ করেছে। ডিএসই ও সিএসই’র লিস্টিং রেগুলেশন এর ১৭নং ধারায় বলা হয়েছে লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যাতিত সকল কোম্পানিকে প্রান্তিক শেষ হওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। এর পাশাপাশি ২য় ও ৩য় প্রান্তিকের প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় ৩০ দিনের পর থেকে দিন প্রতি ৫ হাজার করে টাকা জরিমানা হবে।

এছাড়া বিএসইসি’র ২০০৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জারি করা এক নোটিফিকেশনে বলা হয়েছে লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যাতিত সকল কোম্পানিকে প্রান্তিক শেষ হওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। আর লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে তা ৯০ দিনের মধ্যে করতে হবে। এর পাশাপাশি ৩য় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে।

এজিএম ও ক্যাটাগরি পরিবর্তন : আইন অনুযায়ী জুন ২০১৫ সালের অর্থ বছর শেষ হওয়ার পর কোম্পানিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) আয়োজন করতে ব্যর্থ হওয়ার কোম্পানিটি চলে যায় স্টক এক্সচেঞ্জের ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে। মূলত ডিএসই ও সিএসইর লিস্টিং রেগুলেশনস এবং সিকিউরিটিজ আইনের ভঙ্গের কারণে কোম্পানিটি এই শাস্তি দেয়া হয়েছে। ডিএসই ও সিএসই’র লিস্টিং রেগুলেশনের ১৮ নং ধারা এবং  সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ রুলস ১৯৮৭ এর ১২(৩এ) এবং ১৩নং ধারায় বলা হয়েছে, আর্থিক বছর শেষ হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরী করতে হবে এবং ১৪ দিনের মধ্যে তা স্টক এক্সচেঞ্জ ও কমিশনে জমা দিতে হবে।

মামলা: কোম্পানির ভাষ্যমতে, কিছু সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওয়েস্টার্ন মেরিনের এজিএম সম্পন্ন করা যায়নি। ফলে এজিএম আয়োজন করতে হলে হাইকোর্টের অনুমোদন ছাড়া কোন এজিএম করা যাবে না। আর সেই অনুমোদনের জন্য কোম্পানি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ক্রেডিট রেটিং: সর্বশেষ কোম্পানিটি ৩০ জুন ২০১৪ সমাপ্ত অর্থ বছর এবং ৩১ মার্চ ২০১৫ সমাপ্ত তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ক্রেডিট রেটিং সম্পন্ন করেছে। ওয়েস্টার্ন মেরিনের ওই ক্রেডিট রেটিং রিপোর্টটি প্রস্তুত করেছে ক্রেডিট রেটিং ইনফর্মেশন এন্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (সিআরআইএসএল)। ক্রেডিট রেটিং রিপোর্ট অনুযায়ী কোম্পানির দীর্ঘ মেয়াদে রেটিং হয়েছে ‘বিবিবি+’ এবং স্বল্প মেয়াদে হয়েছে ‘এসটি-৪’। যা দীর্ঘমেয়াদে রিস্ক ফেক্টর খুব সম্ভাবনার লক্ষন। আর স্বল্প মেয়াদে বেশ দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাহাজ রপ্তানী: ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী জিনদাল গ্রুপের জন্য ১০টি পণ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ করতে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের সাথে ৬ কোটি ১২ লাখ ডলার বা ৪৮০ কোটি টাকার একটি চুক্তি হয়। বলা হয়েছিল- যার একেকটিতে আট হাজার ডেডওয়েট টনেজ (ডিডব্লিউটি) বাল্ক বা খোলা পণ্য পরিবহন করা যাবে। প্রথম পর্বে ১৮ মাসের মধ্যে ছয়টি জাহাজ হস্তান্তর করা হবে। এগুলোর নির্মাণ সন্তোষজনক হলে ও হস্তান্তর শেষে দ্বিতীয় পর্বে বাকি চারটি জাহাজ নির্মাণ করার কথা ছিল।

এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব তথ্য জানিয়েছে ওয়েস্টার্ন মেরিন কর্তৃপক্ষ। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় প্রতিটি জাহাজের দৈর্ঘ্য ১২০ মিটার ও প্রস্থ ২০ মিটার হবে। সবগুলো জাহাজ তৈরিতে মোট ২৫ হাজার টন লোহা লাগবে। আর এখন পর্যন্ত এ চুক্তির কোন আপডেট কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।

শেয়ার দর বৃদ্ধি: দীর্ঘদিন কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন অপ্রকাশিত থাকা এবং এজিএম না হওয়াকে কেন্দ্র করে শেয়ার দর কমেছে। এক সময় ৫০ টাকা থেকে কমে এর শেয়ার দর ২০ টাকায় নেমে যায়। এই পরিমান তলানীতে দীর্ঘদিন অবস্থান করে তা আবার গত বছর (২০১৬) অক্টোবরের মধ্য ভাগ থেকে আবার বাড়তে থাকে। যা এখন ২৩ টাকা থেকে বেড়ে অবস্থান করছে ৩৫ টাকায়। অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন সময় কোম্পানিটির এজিএম এবং আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ সংক্রান্ত গুজব ছড়িয়ে কোম্পানিটির শেয়ার দর বাড়ানো হয়েছে।

বিষয়গুলোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চেয়ে কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করা হলে ওয়েস্টার্ন মেরিনের কোম্পানি সচিব শাহাদাত হোসেন শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমকে বলেন, প্রথমে আমাদের কিছু সমস্যার কারণে এজিএম করতে পারিনি। আর তাতে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এখন আদালতের অনুমতি ছাড়া এজিএম সম্পন্ন বা আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারছি না। তবে আদালতে পরবর্তী শুনানিতে আশাকরি এ সমস্যার অবসান হবে। আর তার পরই এজিএম এর আয়োজন করা হবে এবং পরবর্তী সকল আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

কত দিনের মধ্যে এ জটিলতার সমাধান হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে শাহাদাত হোসেন বলেন- এজিএম’র অনুমতি চেয়ে আদালতে আমাদের আবেদন করা আছে। তা কোর্টের শিডিউল অনুযায়ী শুনানির জন্য তারিখ দেয়া হবে, আর এখনো তারিখ পাইনি। তারিখ প্রাপ্তির পরই আদালতের মাধ্যতে এর সমাধান হবে। তবে যে কোনদিন শুনানির তারিখ ঘোষণা করা হতে পারে।

শেয়ারবাজারনিউজ/রু/ম.সা

আপনার মন্তব্য

Top