বিবিআইএন আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজ করবে- মাতলুব আহমেদ

matlub-ahamed

আবদুল মাতলুব আহমেদ একজন সফল ও বহুমূখী শিল্প-উদ্যোক্তা। তিনি নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।  তিনি বিশ্বাস করেন জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং নতুন উদ্যোক্তাদের আগমন, সেই সাথে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিতে। একজন সফল ব্যবসায়ী এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীক সংগঠনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বকালের শেষাংশে দেশের ও বিশ্বের সার্বিক ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ নিয়ে শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমের কথা হল তার সাথে। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় যুক্ত হন শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমের হেড অব বিজনেস বিন্তি জাহান। নিম্নে তার সঙ্গে কথোপকথনের চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো:

শেয়ারবাজারনিউজ: ২০১৭ সালের প্রথমার্ধে রয়েছি আমরা, একজন ব্যবসায়িক নেতা হিসেবে আমাদের দেশের এখনকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন রয়েছে?

মাতলুব আহমেদ: ইতিহাসের যে কোন সময়ের চেয়ে একটা শক্ত ভিত্তির অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আজ পৃথিবীর বাঘা বাঘা দেশগুলো অর্থনৈতিক মন্দায় ভুগছে। যেখানে বাংলাদেশকে বলা হত তলাবিহীন ঝুড়ি, সাইক্লোন আর বন্যার দেশ। সেখান থেকে এখন বলা হচ্ছে- বাংলাদেশ হলো Tiger economy, বাংলাদেশ হলো- Miracle Country। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি শুধু দেশে না, সারা বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ধারণা বদলে গিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এক নতুন রুপ দিয়েছেন এবং সোনার বাংলার পথে আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

শেয়ারবাজারনিউজ: আপনি দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রধান হিসেবে কার্যরত রয়েছেন, আসছে জুনে এর মেয়াদকাল শেষ হতে যাচ্ছে। এই প্রায় ২ বছরের সময়কালে এখানকার কার্যক্রম সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতায় জানতে চাই?

মাতলুব আহমেদ: মনে রাখতে হবে- যেকোন দেশের Apex Trade Body এর বিশাল একটা দায়িত্ব থাকে। আমাদের যে প্রধান কাজ সেটা হল ব্যবসায়ীদের যে মনের আশা Successful হওয়া, তাদের শিল্প ঠিক রাখা, তাদের আমদানি ঠিক রাখা, তাদের Trading ঠিক রাখা, সাথে সাথে সরকারকে পরামর্শ দেয়া কোনদিকে সরকারের যাওয়া উচিত। কোথায় বাংলাদেশের কোন নতুন সম্ভাবনা রয়েছে, যেটা আমাদেরকে ব্যবহার করতে হবে। কোন দেশ রয়েছে পৃথিবীতে যাদের সাথে আমাদের চুক্তি করতে হবে। তাদের সুযোগটা আমাদের পক্ষে ব্যবহার করা। গত দেড় বছরের উপরে ফেডারেশন নিয়ে কাজ করে চলেছি। আমি প্রথমত ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা’কে কারণ তিনি আমাদের একটি শান্তিময় বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন এবং যেখানেই শান্তি, সেখানেই ব্যবসা। যেহেতু এই পৌনে দুই বছরে আমি কোন ধরনের রাজনৈতিক বিড়ম্বনা দেখতে পাইনি, সেহেতু আমার কাজ করতে কোন ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি। যেহেতু বাংলাদেশ সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে ৭.১১ প্রবৃদ্ধিতে পৌছে গিয়েছে এবং আগামীতে আরো উপরে ওঠার চেষ্টা করছে। এইসব দিক দিয়ে আমি আবারো ধন্যবাদ জানাই ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের, বাংলাদেশের জনগণকে, যে তারা সবাই একসাথে বাংলাদেশকে গড়ার কাজে লিপ্ত ছিলেন।

শেয়ারবাজারনিউজ: আমাদের বেগমান এই অর্থনীতি’তে এফবিসিসিআইকে আরো কিভাবে ঢেলে সাজানো যায় অথবা আরো কিভাবে এই সংগঠনটি শক্তিশালী হয়ে কাজ করতে পারে।

মাতলুব আহমেদ: এফবিসিসিআই যেহেতু একটি বড় সংগঠন এবং তার কাজের পরিধিও অনেক বিশাল, সেজন্য আমি মনে করি ফেডারেশনে একটি শক্তিশালী রিসার্চ ইউনিট দরকার। আমরা আজকে অন্যান্য রিসার্চ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করছি কারণ আমাদের রিসার্চ সেন্টারটা এখনও স্বল্প পরিসরে রয়েছে। আমরা মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রজেক্ট দিয়েছি, উত্তরাতে যে আমদের একটি ১০ কাঠা জমি সরকার দিয়েছে সেখানে আমরা International Standard Research Institute গঠন করে তুলব। ইনশাল্লাহ্ এর অর্থ অনুমোদন হওয়ার সম্ভাবনা খুব ভাল; আর এটি হলেই আমরা একটা বিশ্বমানের Research Center করতে পারব। এই Research Center থাকলে সরকারকে যে উপদেশটা আমরা দেই, কিংবা সরকারকে যে কিছু দিক নির্দেশনা আমরা দেই, সেটার পিছনে যে কাগজগুলো লাগে সেগুলো আমাদের হাতে থাকবে এবং আমাদের বলার ভিতরে অনেক শক্তির সঞ্চার করবে। তাই আমি মনে করি আগামীতে এই Research Center যদি ফেডারেশনে আসে তাহলে এফবিসিসিআই এর শক্তি বিগত দিনের চেয়ে অনেকগুন বেড়ে যাবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: সরকারের নীতি নির্ধারণী কার্যক্রমগুলো কতটুকু ব্যবসা বান্ধব বলে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আপনি মনে করেন।

মাতলুব আহমেদ: মনে রাখতে হবে, সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিছুদিন আগে হবিগঞ্জে `ease of doing business’ কিভাবে করা যায় তা নিয়ে দু-দিনের সেমিনার হয়েছে। ওখানে ওনার বক্তব্যের মধ্যে প্রথমেই বলেছিলেন, সরকারী কর্মকর্তারা যেকোন কাজে প্রথমেই বলেন ‘না’ এবং যদি ‘হ্যা’ বলতেই হয়, প্রথমেই বলেন ‘নো অবজেকশন’ তারপরও ‘হ্যা’ বলেন না। কিন্তু সেখান থেকে সরকার এখন অনেক বদলে গেছে। এখন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং প্রাইভেট সেক্টর এর গ্রোথ এবং private Sector Driven Economy এই ‍দুটো পলিসি নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। `This is the best ever policy a government has taken in the history of Bangladesh.’

শেয়ারবাজারনিউজ: USA President Election বিশ্ব অর্থনীতি এবং রাজনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাথে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় এবং তার দায়িত্বগ্রহণের পর তার গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর আলোচনা এবং সমালোচনা। সবটুকু আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে কেমন দেখছেন?

মাতলুব আহমেদ: আমি প্রথমে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাই, যে তিনি সনাতন ধর্মী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চাইতে একটু আলাদা এবং উনি কখনও যে রাজনীতি করেন নাই, সেখানে এসে আমেরিকার সর্বোচ্চ পজিশনে উনি নিজেকে নিতে পেরেছেন। এটা একটা অবশ্যই অনেক বড় একটা বিষয়, দ্বিতীয়ত উনি এসেই বলেছেন আমার দেশের সীমানা আমি সুরক্ষিত না করে আমি অন্যদের সীমানা সুরক্ষা করছি। আমার দেশের ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দিয়ে শুধু চায়না’তে ফ্যাক্টরি করছি। ওনার কথার ভেতরে একটা জিনিসই প্রকাশ পায় তিনি আমেরিকাকে ভালবাসেন, আমেরিকার জনগণকে ভালবাসেন, আমেরিকার অর্থনীতিকে আরো উপরে তুলতে চান।

ওনার প্রথম যে পদক্ষেপ ছিল টিপিপি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা। এই পদক্ষেপে বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে। কারণ বেশ কয়েক বছর ধরে USA আমদানিতে বাংলাদেশকে কোন সুযোগ দিচ্ছিল না। উপরন্তু ওনারা চায়না এবং এই টিপিপি এর মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যত দেশ আছে, প্রত্যেকে তারা একটা বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। এটা বাতিল হওয়াতে আর চায়নার ওপর শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা দেখে আমরা যারা বাংলাদেশে রপ্তানী বানিজ্য করি তারা মনে করি এটা আমাদের পক্ষে আসবে। সেই হিসাবে আমি ট্রাম্পকে আরো একবার ধন্যবাদ জানাই।

শেয়ারবাজারনিউজ: আমাদের অর্থনীতির কাঠামো আরো সুদৃর করতে আমাদের পার্শবর্তী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের আরো উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আপনার কি মনে হয়, এর জন্য আরো কি ধরণের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন?

মাতলুব আহমেদ:  এখন পৃথিবীর মধ্যে যে Global Trade Practice আছে এবং Gobal যে concession এর উপরে ব্যবসা-বানিজ্য চলছিল, এখান থেকে পৃথিবী কিন্তু কিছুটা হলেও সরে আসবে। এখন নতুন যে আওয়াজ তা হল Regional Connectivity বা আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়ন। তার মানে আমার আশেপাশে প্রতিবেশী যে দেশসমূহ রয়েছে তাদের সাথে আমার ব্যবসা-বানিজ্য যোগ করতে হবে। আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, মোদী সরকার, বাংলাদেশের সরকার, নেপাল সরকার এবং ভুটান সরকার- আমাদের এই চার দেশের মধ্যে BBIN Road Connectivity চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। তিন দেশে এই চুক্তি অনুমোদন হয়ে গেছে। ভুটানে একটু বাকি আছে এবং আমরা আশা রাখি ভুটানেরটাও খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।

এই যে আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য এই চার দেশের মধ্যে মানুষ-মানুষে যোগাযোগ বা যানবাহনের অবাধ যোগাযোগ শুরু হবে যা BBIN এর লক্ষ্য। ইউরোপে যেমন মানুষ এবং পন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে পারে, আমরাও চেষ্টা করছি BBIN এর মাধ্যমে মানুষ এবং পন্য অবাধ চলাফেরার উন্নয়ন ঘটাতে। BBIN যত তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং BBIN নিয়ে যত চেম্বার এবং ব্যবসায়ীরা কাজ করবেন তত বেশি উপকৃত হবে। সেই সাথে উপকৃত হবে বাংলাদেশ। কারণ বাংলাদেশ এই চার দেশের মধ্য একটি মধ্যস্থ জায়গায় অবস্থান করছে। এই জন্য আমি ফেডারেশন থেকে আগামী BBIN Chamber কে স্বাগত জানাই, BBIN travel card কে স্বাগত জানাই এমনকি এই চার দেশের মধ্যে যাতায়াতের জন্য ভিসা প্রসেসটাও সহজ করে দিয়ে BBIN Card এর মাধ্যমে চলাচল করতে পারব এমন একটা পরিস্থিতি আমরা দেখতে চাই। BBIN আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা এই চার দেশের ব্যবসায়ীক উন্নয়নে এবং অর্থনীতির চাকা আরো বেগবান করতে কাজ করবে।

শেয়ারবাজারনিউজ:  বাংলাদেশ এই নামটি এখন সমাদৃত বিশ্ব দরবারে। আপনার কাছে আমার সর্বশেষ প্রশ্ন একজন সফল উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং সংগঠনের প্রধান হিসেবে নতুন উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের জন্য আপনার উপদেশ কি হবে?

মাতলুব আহমেদ: নতুন প্রজন্ম যারা ব্যবসায়ে নামছেন, শিল্পে নামছেন, তাদেরকে প্রথমেই বলতে হয় যে, তারা খুব ভাগ্যবান, তারা বাংলাদেশকে পেয়েছে একটা টাইগার কান্ট্রি হিসেবে। বাংলাদেশকে পেয়েছে একটা ডিজিটাল কান্ট্রি হিসেবে। বাংলাদেশকে পেয়েছে একটা শক্তিশালী নেতৃত্বের অধীনে। বাংলাদেশে রপ্তানী বেড়েছে, অনেক খাতে উদ্ভাবন হচ্ছে, সম্ভাবনার খাতগুলো অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। ফুটওয়্যার, টেক্সটাইল, শিপবিল্ডিং, প্লাস্টিক এগুলো প্রায় অনেক খাতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। তাই নতুন প্রজন্মকে আমি অনেক ভাগ্যবান বলব, কারণ ব্যাংকেও এখন অনেক চাপ, তারা উদ্যোক্তা খুজছে, তাই তাদের কাজ হবে- একজন ভাল উদ্যোক্তার গুনাবলী আহরণ করা। তারা পড়াশোনা, কারিগরী শিক্ষা অথবা বিভিন্ন সেমিনার, আলোচনা সভা, ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে সংযুক্ত হয়ে এর উন্নয়ন ঘটাতে পারে। এখনই একজন উদ্যোক্তা তাকে পুরোপুরি তৈরী করতে পারবেন। তাদের জন্য সফল উন্নতির দরজা উন্মোচন হয়ে যাবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মাতলুব আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

Top