ওয়ারেন বাফেটের গুরু বেঞ্জামিন গ্রাহাম

graham 2শেয়ারবাজার রিপোর্ট: শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমের শেয়ারবাজার লিজেন্ড বিভাগে এ পর্যন্ত ৮জন শেয়ারবাজার লিজেন্ডের সংক্ষিপ্ত জীবন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিটি জীবনীতেই বিনিয়োগকারীদের জন্য নানা দিক নির্দেশনা রয়েছে। এ পর্যায়ে বেঞ্জামিন গ্রাহামের সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রকাশ করা হলো যাকে সারা বিশ্বে আলোড়নকারী বিনিয়োগকারী এবং এই সেক্টরের গুরু হিসেবে সবাই এক বাক্যে মেনে চলেন।

যে জন্য বিখ্যাত: তিনি ওয়ারেন বাফেটের পরামর্শ দাতা। শুধু কি তাই? ইনভেষ্টমেন্ট ম্যানেজার ও ফিন্যান্সের গুরুও বটে। তিনি বেঞ্জামিন গ্রাহাম যিনি মৌলভিত্তি’র বিনিয়োগের জন্য সিকিউরিটিজ অ্যানালাইসিস ও ভ্যালু ইনভেষ্টিং এ দুটি পদ্ধতির জনক হিসেবে পরিচিত। শেয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য তার রচিত ‘সিকিউরিটিজ অ্যানালাইসিস (১৯৩৪)’ এবং ‘ দ্য ইন্টিলিজেন্ট ইনভেষ্টমেন্ট (১৯৪৯)’ বই দুটি এ যাবৎকালের শ্রেষ্ঠ বই হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। পোর্টফলিও ইনভেষ্টমেন্টে ১৯ শতকে সবচেয়ে চিন্তাশীল ব্যক্তি হচ্ছেন বেঞ্জামিন গ্রাহাম।

পারসোনাল প্রোফাইল

১৮৯৫ সালে এক বছর বয়সে শিশু বেঞ্জাজিম গ্রাহাম ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় চলে আসেন। তিনি নিউইয়র্ক এর ব্রুকলিন ও মানহাত্থানে বেড়ে উঠেন। ৯ বছর বয়সেই তিনি তার বাবাকে হারান এবং তারপর থেকেই এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গ্রাহামকে দিন পার করতে হয়। ১৯১৪ সালে গ্রাহাম কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর দেরি না করেই তিনি ওয়াল স্ট্রীট ফার্ম, নিউ বার্গার, হ্যান্ডারসন অ্যান লোয়েবে মেসেঞ্জার হিসেবে কাজ করেন। ১৯২০ সালে গ্রাহাম ফার্মটির পার্টনার হিসেবে কাজ করেন। graham

১৯২৬ সালে গ্রাহাম জেরুমি নিউম্যানের সঙ্গে একটি ইনভেষ্টমেন্ট পার্টনারশীপ এবং কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ফাইন্যান্সের লেকচারার হিসেবে কাজ করেন। ১৯২৯ সালে স্টক মার্কেটে ধসে গ্রাহাম ব্যক্তিগতভাবে ভেঙ্গে পড়লেও তার ইনভেষ্টমেন্ট পার্টনারশীপ টিকে থাকে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তার এই প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতি পুষিয়ে নেয়। জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৩৪ সালে সহকারী লেখক হিসেবে ‘সিকিউরিটি অ্যানালাইসিস’ বই বের করেন বেঞ্জামিন গ্রাহাম। গ্রাহামের পার্টনারশীপ ব্যবসা ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ১৭ শতাংশ রিটার্ন দিতে থাকে।

গ্রাহামের বিনিয়োগের কৌশল:

১৯৮৪ সালে ‘সিকিউরিটিজ অ্যানালাইসিস’ এর ৫০ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ওয়ারেন বাফেট কলাম্বিয়া এসে গ্রাহামের বিনিয়োগ কৌশল সম্পর্কে বলেন, আসলে অল্প কথায় গ্রাহামের বিনিয়োগ কৌশল বর্ননা করা সত্যিই কঠিন। তবে সংক্ষেপে গ্রাহামের ভ্যালু ইনভেষ্টিং নিয়ে বলা যায় যে, একজন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন তারচেয়ে অনেক বেশি তার বিনিয়োগকে মূল্য দিতে হবে। গ্রাহাম বিশ্লেষণে বিশ্বাস করতেন, ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইসিস করার পক্ষে থাকতেন গ্রাহাম। যেসব কোম্পানির ব্যালেন্স শিট অত্যন্ত মজবুত গ্রাহাম সেসব কোম্পানিকে বাছাই করতেন। এছাড়া যেসব কোম্পানির অল্প পরিমাণ ঋণ রয়েছে, এভারেজ প্রফিজ মার্জিনের ওপরে রয়েছে এবং যথেষ্ট ক্যাশ ফ্লো রয়েছে। গ্রাহাম মার্জিন অব সেফটি আবিষ্কার করেছেন যার অর্থ হচ্ছে সেসব কোম্পানি খুঁজে বের করা যেগুলোর শেয়ার দর আন্ডার ভ্যালু অবস্থায় রয়েছে কিন্তু এগুলো ফান্ডামেন্টাল, দীর্ঘমেয়াদিতে শক্তিশালী এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন রয়েছে। যেকোন ইনভেষ্টে মার্জিন অব সেফটি হচ্ছে শেয়ারের ক্রয়মূল্য ও অন্তর্নিহিত মূল্যের পার্থক্য। এটা অবশ্যই অন্তর্নিহিত মূল্যের চেয়ে ক্রয়মূল্য কম থাকতে হবে। কোম্পানির শেয়ারের প্রাইস আর্নিং রেশিও (পি/ই রেশি), প্রাইস টু বুক রেশিও (পি/বি রেশিও) এবং প্রাইস টু সেল রেশিও (পি/এস রেশিও) দেখে বিনিয়োগ করতে হবে।

graham 3

গ্রাহাম বিশ্বাস করেন যে, শেয়ারের মার্কেট ভ্যালু বা স্টক প্রাইস সবসময় ভুল হয়। কারন স্টক প্রাইস সবসময় এর প্রকৃত ভ্যালুর অবস্থায় থাকে না। স্মার্ট ইনভেষ্টরদের তিনি সবসময় পরামর্শ দেন যে  ‘যখন কোম্পানির শেয়ার দর টানা পড়তে থাকে তখনই বিচক্ষণতার সাথে কিনতে হয় আর যখনই শেয়ার দর ঊর্ধ্বগতিতে থাকে তখনই বিক্রি করে বের হতে হয়’।

গ্রাহামের প্রকাশনা

০১. “সিকিউরিটি অ্যানালাইসিস (১৯৩৪), বেঞ্জামিন গ্রাহাম  ও ডেভিড ডড”।

০২. “দ্য ইন্টিলিজেন্ট ইনভেষ্টর (১৯৪৯)”।

০৩. “বেঞ্জামিন গ্রাহাম: দ্য মেমোরিজ অব দ্য ডিন অব ওয়াল স্ট্রিট”, বেঞ্জামিন গ্রাহাম ও সায়মর চ্যাটম্যান (১৯৯৬)।

০৪. “বেঞ্জামিন গ্রাহাম অন ভ্যালু ইনভেষ্টিং: লেসনস ফরম দ্য ডিন অব ওয়াল স্ট্রিট”, জেনিট ল’ই (১৯৯৯)”।

গ্রাহামের বাণী

০১. সন্তোষজনক বিনিয়োগ অর্জন করতে হলে রেজাল্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ যা অবশ্য বেশিরভাগ লোক যা বুঝতে পারে তার চেয়ে সহজ। কিন্তু উচ্চতর রেজাল্ট ততই কঠিন যা বেশিরভাগ লোক বুঝতে পারে না।

০২. বেশিরভাগ সময় শেয়ার অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত মূল্যে উঠা-নামা করে। এতে ফটকাবাজ বা গেমব্লিংয়ের প্রভাব বেশি থাকে। এসব শেয়ার ত্যাগ করুন।graham 4

০৩. এমনকি ইন্টিলিজেন্ট ইনভেষ্টররা যদি ঐসব জাঙ্ক শেয়ারের প্রতি আগ্রহ হয় তখনও নয়।

০৪. এটা মনে করা হাস্যকর যে সাধারণ মানুষ মার্কেট থেকে টাকা বের করতে পারে।

০৫. ব্যক্তি বিনিয়োগকারীকে সবসময় বিনিয়োগকারীর আচরণ করতে হবে গুপ্তচর নয়।

০৬. বিনিয়োগকারীদের সেভাবে শেয়ার কেনা উচিত যেভাবে তারা মুদি মাল দোকান থেকে কিনে অর্থাৎ দেখে শুনে ভালোটা।

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

Top