মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করে ড্যাফোডিলের জমজমাট ব্যবসা !

Daffodil comরেজাউল করিম রকি: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের কোম্পানি ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করে জমজমাট ব্যবসা করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ ধারাবাহিক মুনাফায় থাকলেও টানা দুই বছর শেয়ারহোল্ডারদের কোন ডিভিডেন্ড দিচ্ছে না।

এ বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সহযোগী (সাবসিডিয়ারি) প্রতিষ্ঠানে পুনরায় বিনিয়োগ করার কারণে তারল্য সঙ্কট দেখা দেয়। তাই পরপর দুই বছর শেয়ারহোল্ডারদের কোন ডিভিডেন্ড দেয়া সম্ভব হয়নি।

যদিও কোম্পানিটি ২০১০ সালে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ২২ কোটি ৮৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা উত্তোলন করেছিল। এ অর্থ কোম্পানিটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বিনিয়োগ করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। তারপরও সহযোগী এ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগে ঘাটতি থাকায় কোম্পানিটি বার্ষিক মুনাফার অর্থ থেকে পুনরায় বিনিয়োগ করে। কিন্তু এর জন্য শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নেয়া প্রয়োজন বোধ করেনি কোম্পানিটি। মূল্য সংবেদনশীল এ তথ্য গোপন করে কোম্পানিটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

২০১৩ সালের সমাপ্ত অর্থবছরে ৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা মুনাফা করেও বিনিয়োগকারীদের কোন ধরণের ডিভিডেন্ড দেয়নি। এদিকে ২০১৪ হিসাব বছরে ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা নীট মুনাফা করেও কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের জন্য নো-ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। তাই কোম্পানিটি বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটির শেয়ার বর্তমানে নন-মার্জিনেবল পজিশনে রয়েছে। পরিণতিতে এ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে এবং এর শেয়ারের বিপরীতে যাদের মার্জিন ঋণ রয়েছে ওইসব বিনিয়োগকারী বর্তমানে লোকসানে রয়েছেন। তাছাড়া মুনাফায় থাকা সত্ত্বেও এ কোম্পানি থেকে ডিভিডেন্ড না পেয়ে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা আরো ভারি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বিনিয়োগ করার ঘোষণা দিয়ে ২০১০ সালে পুঁজিবাজার থেকে রাইট ইস্যুর মাধ্যমে ২২ কোটি ৮৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা উত্তোলন করে কোম্পানিটি। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে অর্থাৎ ২০১১ সালে কোম্পানিটি এ খাতে বিনিয়োগ করে ৯ কোটি ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৮৪ টাকা। পরবর্তী বছরে অর্থাৎ ২০১২ সালে এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে হয় ২২ কোটি ৮৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ রাইটের সম্পূর্ণ অর্থই স্কুলটিতে বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু তাতেও ঘাটতি পূরণ না হওয়ায় ২০১৩ সালে স্কুলটিতে পুনরায় ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪৮ হাজার ৮৭০ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে আরোও ৩ কোটি ১২ লাখ ৪৪ হাজার ২৮৮ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। বর্তমানে স্কুলটিতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৩ কোটি ৩২ লাখ ৮১ হাজার ১৫৮ টাকা। অর্থাৎ স্কুলটিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ কোটি ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার ১৫৮ টাকা বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এ টাকার পুরোটাই কোম্পানির মুনাফা এবং সঞ্চিতি থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে। তাই কোম্পানিটি মুনাফায় থাকলেও বর্তমানে তারল্য সঙ্কটে ভুগছে। কিন্তু এ অতিরিক্ত বিনিয়োগের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নেয়া প্রয়োজন মনে করেনি কোম্পানিটি।

এছাড়া কোম্পানিটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডলফিন কম্পিউটারে ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, জবসবিডি ডট কমে (jobsbd.com) ২ কোটি ১২ লাখ ৯৭ হাজার ২৮২ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০১৪ হিসাব বছরে স্কুল থেকে কোম্পানিটির লোকসান হয়েছে ১ কোটি ৬৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮৭ টাকা এবং জবসবিডি ডট কম থেকে লোকসান হয়েছে ৭৯ লাখ ৫৯ হাজার ৯৯ টাকা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আইন অনুযায়ী কোম্পানির কোন সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে হলে আগে সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিতে হবে।

কিন্তু মূল্য সংবেদনশীল এ বিষয়টি বিএসইসি, ডিএসই কিংবা সিএসই-কেও জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি কোম্পানিটি। অথচ মূল্য সংবেদনশীল তথ্য কি সে সম্পর্কে বিএসইসির আইনে স্পষ্ট করে বলা রয়েছে। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ১৯৯৩ (১৯৯৩ সালের ১৫নং আইন) এর ২৫ ধারা (ঘ) এর বিধিমালা অনুযায়ী ‘মূল্য সংবেদনশীল তথ্য’ অর্থ এইরূপ তথ্য যাহা প্রকাশিত হইলে সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটির বাজার মূল্য প্রভাবিত হইতে পারে এবং নিম্নবর্ণিত তথ্যাবলী এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হইবে, যথাঃ- (অ) কোম্পানির আর্থিক অবস্থা সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা এতদসংক্রান্ত মৌলিক তথ্য;(আ) লভ্যাংশ সংক্রান্ত তথ্য; (ই) সিকিউরিটি হোল্ডারগণকে রাইট শেয়ার, বোনাস ইস্যু করা বা অনুরূপ সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত;(ঈ) কোম্পানির কোনো স্থায়ী সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত;(উ) কোম্পানির বিএমআরই বা নতুন ইউনিট স্থাপন সংক্রান্ত তথ্য; (ঊ) কোম্পানির কার্যাবলির ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন (যেমন- উৎপাদিত সামগ্রী, পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন বা এতদসম্পর্কিত নীতিনির্ধারণ ইত্যাদি);(ঋ) কমিশন কর্তৃক সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো তথ্য।

এ বিষয়ে চট্রগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়ালি-উল-মারুফ মতিন শেয়ারবাজার বাজার নিউজ ডট কমকে বলেন, সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করার আগে কোম্পানিটিকে অবশ্যই শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিতে হবে। কারণ এটি একটি মূল্য সংবেদনশীল তথ্য।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কোম্পানি সেক্রেটারী মো: মনির হোসেন শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমকে বলেন, আমাদের তারল্যের ঘাটতি থাকায় ডিভিডেন্ড দিতে পারিনি এবং স্টক ডিভিডেন্ড দিতে আমাদের কিছু বিধি নিষেধ রয়েছে। তাই স্টক ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়নি। কারণ কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৪৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা। যদিও কোম্পানিটির রিজার্ভ রয়েছে ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

তারল্য ঘাটতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও জানান, আমাদের নীট মুনাফার অংশটা পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়েছে স্কুলের জমি ক্রয়ের কাজে। এর জন্য বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) করা হয়নি। কোম্পানির পরিচালকরা নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী ইনভেস্ট করেছে এখানে বিনিয়োগকারীদের কোন ধরণের অনুমতি নেওয়া হয়নি।

শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন ছাড়া পুন:বিনিয়োগ কিভাবে করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরণের বিনিয়োগের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন হলেই এভাবে বিনিয়োগ করা যাবে।

প্রসঙ্গত, ২০১১ ও ২০১২ অর্থ-বছরে ১০ শতাংশ করে ডিভিডেন্ড দিলেও এর পরই মুনাফায় থাকা সত্ত্বেও তারল্য সঙ্কট দেখিয়ে ডিভিডেন্ড দেয়া বন্ধ করে দেয় কোম্পানিটি। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর ১১.৯০ টাকা। ৪৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা পরিশোধীত মূলধনী কোম্পানিটির ৪৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকের কাছে এবং ৫৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে তথ্য-প্রযুক্তি খাতে সরকারি প্রনোদনা ও কর রেয়াত সুবিধা থাকলও পুঁজিবাজারের প্রযুক্তি খাতের কোনো কোম্পানিই তা কাজে লাগাতে পারছে না। ব্যাতিক্রম থাকেনি ড্যাফোডিল কম্পিউটারর্সও।

শেয়ারবাজার/মুকুল/তু/সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top