মিউচ্যুয়াল ফান্ড: স্টক ডিভিডেন্ড ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ বন্ধ হোক

Editorialযেকোন দেশের পুঁজিবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বাজারকে শক্তিশালী করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। সাধারণ বিনিয়োগকারী, পেনশন হোল্ডারস, গৃহিনী যারা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করার চেয়ে পেশাদার ফান্ড ম্যানেজার কর্তৃক পরিচালিত মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করে বছর শেষে ভাল লভ্যাংশ পায়। আমাদের দেশের মিউচ্যুয়াল ফান্ডের অবস্থা ঠিক বিপরীত, মিউচ্যুয়াল ফান্ড বাজারকে কোনভাবেই প্রভাবিত করতে পারছে না। সামগ্রিক বাজার মূলধন, লেনদেনে এর অংশ খুবই কম। এর কোন চাহিদা বিনিয়োগকারীর নিকট নেই। তাই মিউচ্যুয়াল ফান্ড, নেট অ্যাসেট ভ্যালুর ৫০% পর্যন্ত কমে বিক্রি হচ্ছে। অথচ বাজারকে শক্তিশালী করতে হলে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে জনপ্রিয় করার কোন বিকল্প নাই। বিষয়টি যে বিএসইসি কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করতে পারে না তা নয়, বিএসইসি জনগণের/বিনিয়োগকারীর স্বার্থ না দেখে কতিপয় ফান্ড ম্যানেজারদের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে। ফান্ড ম্যানেজাররা যাতে ফান্ডের আকৃতি বৃদ্ধির মাধ্যমে কমিশন বেশী পায় তার সুযোগ করে দিচ্ছে বিএসইসি।

বর্তমানে মোট ৯টি সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি ৩৬টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড পরিচালনা করছে। তার মধ্যে ১০টি করে মিউচ্যুয়াল ফান্ড পরিচালনা করছে যথাক্রমে আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট এবং রেস ম্যানেজমেন্ট। রেস ম্যানেজমেন্ট ৩০ জুন ২০১৬ সমাপ্ত বছরে তাদের পরিচালিত ১০টি ফান্ডেই নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে রি-ইনভেষ্টমেন্ট ইউনিট (RIU) বা স্টক ডিভিডেন্ড প্রদান করেছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করা হয়েছে। যেমন পিএইচপি মিউচ্যুয়াল ফান্ডে ৭% RIU প্রদান করা হয়েছে। ৭% RIU এর মাধ্যমে প্রাপ্ত শেয়ারের বাজার মূল্য ছিল ৩.৫০ টাকারও কম অখচ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করা হলে বিনিয়োগকারী প্রায় ৭.০০ টাকাই লভ্যাংশ পেতো। এখানেই স্পন্সর,ট্রাস্টি এবং কাস্টডিয়ান হিসাবে যথাক্রমে পিএইচপি গ্রুপ, বিজিআিইসি এবং ব্রাক ব্যাংকও তাদের স্ব স্ব দায়িত্ব এড়াতে পারে না। সর্বোপরি এসব দেখার দায়িত্ব রেগুলেটরি বডি হিসাবে বিএসইসির। কিন্তু দুর্ভাগ্য বিনিয়োগকারীদের যে এই দেশে অন্য সকল সেক্টরের ন্যায় এখানেও কোন জবাবদিহিতা নেই।

একটি মিউচ্যুয়াল ফান্ড বাজারে আসার প্রাক্কালেই এর সাইজ, আয়ুস্কাল ইত্যাদি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, তাই RIU প্রদানের মাধ্যমে এর সাইজ বৃদ্ধি বা সাধারণ সভা করে মেয়াদ বৃদ্ধি করা, মিউচ্যুয়াল ফান্ড ধারনার পরিপন্থি। বর্তমানে আইন করে মিউচ্যুয়াল ফান্ড এর মেয়াদ ১০ বছর করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিএসইসি ভবিষ্যতে কোন রকম মেয়াদ বৃদ্ধির সুযোগ দেবে না বলে আমরা আশা করি। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে তাই  RIU প্রদান আইন করে বন্ধ করা হোক বা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে নীতিমালা করা হোক।

আর একটি বিষয় হলো বিভিন্ন অখ্যাত/পারিবারিক কোম্পানিতে প্লেসমেন্ট এর মাধ্যমে বিনিয়োগ। এটি আমানতের খেয়ানত এর শামিল। যেমন রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট তাদের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত নিম্নোক্ত ১০টি ফান্ডে ফার্মারস ব্যাংক এর ইক্যুইটি শেযারে মোট ৪৭.০০ কোটি টাকা এবং মাল্টি সিকিউরিটিজ নামক ব্রোকার হাউজের ইক্যুইটি শেয়ারে মোট ৭৫.৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ২০১৯ সাল হতে তাদের বিভিন্ন ফান্ডের মেয়াদ উত্তীর্ণ হতে শুরু করলে কিভাবে তারা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করবে বা এসব বিনিয়োগ হতে এ পর্যন্ত কোন রিটার্ন অর্জিত হয়েছে কিনা তা দেখা দরকার। তাই কোন প্লেসমেন্টে বিনিয়োগের আগে বিএসইসির অনুমোদন নেয়ার শর্তারোপ করা হোক।

রেস ম্যানেজমেন্ট কর্তৃক পরিচালিত ফান্ডে অতালিকাভুক্ত শেয়ারে বিনিয়োগঃ

ক্রমিক নং মিউচুয়াল ফান্ডের নাম মাল্টি সিকিউরিটিজ

এন্ড সার্ভিসেস লিঃ

ফার্মারস ব্যাংক লিঃ
ইবিএল ফার্স্ট মিউ ফান্ড ৫০২৩৫৭২৬.০০ ৪৪৭২২২২৩.০০
ট্রাস্ট ব্যাংক ফাস্ট মিউ ফান্ড ৯০৪২৪৪৩২.০০ ৯৯৪৪৪৪৪৩.০০
আ্ইএফআইসি ফাস্ট মিউ ফান্ড ৫০২৩৫৭২৫.০০ ৫৭৫০০০০১.০০
ফাস্ট জনতা মিউ ফান্ড ৯০৪২৪৪৩২.০০ ৬৩৮৮৮৮৯০.০০
পপুলার লা্ইফ মিউ ফান্ড ৯০৪২৪৪৩২.০০ ২৫৫৫৫৫৫৬.০০
পিএ্ইচপি মিউ ফান্ড ৯০৪২৪৪৩২.০০ ২৫৫৫৫৫৫৬.০০
ইবিএল এনআরবি মিউ ফান্ড ৬০২৮৩০৬১.০০ ৬৩৮৮৮৮৯০.০০
এবি ব্যাংক মিউ ফান্ড ৭০৩৩০০৭৯.০০ ৬৩৮৮৮৮৯০.০০
ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড ১২৩৫৮০৩৮৭.০০ ২৫৫৫৫৫৫৫৭.০০
১০ এক্সিম ব্যাংক ফাস্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড ৪০১৮৮৭০৭.০০
  সর্বমোট বিনিয়োগ ৭৫,৬৫,৫১৪১৩.০০ ৭০,০০,০০০০৬.০০

মিউচ্যুয়াল ফান্ড এর প্রতি বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হলেই এর দাম ন্যাভ (Net Asset Value) এর উপরে থাকবে। আর বিনিয়োগকারীকে ভাল লভ্যাংশ প্রদান ব্যাতিরেকে তা সম্ভব নয়। আর বাজার মূল্য ন্যাভ এর নিচে থাকলে কেউই স্পন্সর হিসাবে নতুন মিউচ্যুয়াল ফান্ডের স্পন্সর হিসাবে বিনিয়োগ করবে না। কারন সে জানে যে এটি মার্কেটে কোনভাবেই সাবস্ক্রিপশন হবে না।  আর এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে কিছুদিন পরেই এসব এ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির অফিস বন্ধ হওয়ার মাধ্যমে কিছু লোক বেকার হবে। বিএসইসি কে এসব বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভেবে আগামী জুন সমাপ্ত বছরের লভ্যাংশ ঘোষণার পূর্বে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

উল্লেখ্য, বিএসইসির ০৭ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখের ৫৬১তম কমিশন সভায় অন্যান্যের মধ্যে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যা একই তারিখের প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়ঃ

“এছাড়াও কমিশন অদ্যকার সভায় সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন(মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা ২০০১ এর অন্যান্যের মধ্যে কিছু সংশোধনীর খসড়া অনুমোদন করেছে। যা জনমত জরিপের জন্য দৈনিক পত্রিকা ও কমিশনের ওয়েব সা্ইটে প্রকাশ করা হবে।” কিন্তু দুঃখের বিষয় এ ব্যাপারে অজ্ঞাত কারনে গত দুই বছরে কোন অগ্রগতি হয়নি।

আফরোজা সুলতানা

বিনিয়োগকারী

৩/৪ পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

Top