ইসলামী ব্যাংকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন: সিপিডি

Islami bankশেয়ারবাজার রিপোর্ট: ইসলামী ব্যাংকে চলমান বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রক সংস্থাদের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটির আমানতকারীদের স্বার্থে তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাদের কোন কার্যক্রম দেখা যায়নি।

সম্প্রতি দেশের অর্থনীতি পর্যালোচনা শীর্ষক সভায় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ইসলামী ব্যাংকে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন নিয়ে এমন কথা বলে।

সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোন পদক্ষেপ আমাদের নজরে আসেনি।

২৫ মে ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র পরিচালক সৈয়দ আহসানুল আলম এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র পরিচালক আবদুল মাবুদ পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ব্যাংকটির ৩৪ তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) আহসানুল আলম ও আবদুল মাবুদকে তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এর দুই দিন পরই তারা পদত্যাগ করেন। ১১ মে আহসানুল আলম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে জানান, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে নিয়ে প্লাস-মাইনাসের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তাই পরিচালনা পর্ষদ ও ভাইস চেয়ারম্যানের পদে দায়িত্ব পালন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে ব্যাংকটির শীর্ষ পদে বড় ধরণের পরিবর্তন হয়েছে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাম্প্রতিক ব্যাংকটির ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের কারণে এর সুশাসান নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষত ব্যাংকটির একটি বড় গ্রাহক এর পর্ষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেয়ার বিষয়টি প্রধান উদ্বেগের কারণ। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

তিনি আরো বলেন, ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকার ব্যাংকটিতে হস্তক্ষেপ করেছে। সিপিডি সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাবে। এ ধরণের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।

তবে পরিবর্তনের কারণে বড় গ্রাহক যখন বড় অংশের মালিকে পরিণত হয় তখন ব্যাংকের সুশাসনে ঘাটতি আনবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

তবে সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ইসলামী ব্যাংকে চলমান অবস্থা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোন বিবৃতি দেয়া সমিচিন হবে না। তিনি মনে করেন, ব্যাংকটির পরিবর্তনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সায় দেয়া উচিত। তবে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ কাজে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নজরদারী বাড়াতে হবে।

এদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, কিছু অযোগ্য লোককে নিয়োগ দিয়ে সরকার নিজেই ব্যাংকটিকে বিপদে ফেলেছে। আর এমন সিদ্ধান্তের  কারণে দেশের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান বেসরকারী ব্যাংকটির অবস্থা সরকারী ব্যাংকগুলোর মতোই অবস্থা হবে।

তিনি আরো বলেন, যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের এমন পরিবর্তনের বিপক্ষে ছিল। তারা সরকারকে সেটা জানিয়েছেও।  সরকারই যেহেতু সরাসরি সিদ্ধান্ত দিচ্ছে তাই এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও কিছু করার নেই।

তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরামর্শ দেন, পর্ষদের ঋণ অনুমোদন গুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথ ভাবে দেখে অনুমোদন দেয়। যাতে পর্ষদ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক্তি কিংবা একই ব্যক্তির কাছে বেশি ঋণ না যায়। ইসলামী ব্যাংকের ঋণে অনিয়ম বন্ধ করাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন পিআরআই এর নির্বাহী পরিচালক।

গত ৫ জানুয়ারি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পরিবর্তন করা হয়। তবে ব্যাংকটির পর্ষদে পরিবর্তন প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৬ সালের জুন থেকে। ২ জুন ব্যাংকটির ৩৩তম বার্ষিক সাধারণ সভায় নতুন শেয়ারহোল্ডার পরিচালক ও স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়।

ব্যাংকটির পরিচালকদের কোন্দল আলোচনায় শুরু হয় স্বতন্ত্র পরিচালক সৈয়দ আহসানুল আলমের ফেসবুকে দেওয়া পোস্টের মাধ্যমে। গত ১১ মে তিনি নিজের ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে জানান, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে নিয়ে প্লাস-মাইনাসের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তাই পরিচালনা পর্ষদ ও ভাইস চেয়ারম্যানের পদে দায়িত্ব পালন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার সরে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এরপর গত ১৩ মে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভা শেষে স্বতন্ত্র এই পরিচালক কয়েকটি গণমাধ্যমকে জানান, জাকাতের ৪৫০ কোটি টাকা ব্যাংকের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর জাকাত তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ইফতারের ১৩ কোটি টাকা এবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের সুবিধাভোগীদের তালিকাও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এ ঘোষণার পর বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে জাকাতের ৪৫০ কোটি টাকা প্রধানমন্ত্রীর জাকাত তহবিলের প্রদানের বিষয়ে সমালোচনা তৈরি হয়।

এর প্রেক্ষিতে গত ১৬ মে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আরাস্তু খানকে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। গত ১৭ মে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার জবাব দিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান। এ সময় তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ আহসানুল আলম ব্যাংকের গোপনীয়তা ভেঙেছেন। পরিচালক হওয়ার সময় তিনি গোপনীয়তা রক্ষার যে শপথ করেছিলেন, তা লঙ্ঘন করেছেন। ব্যাংক নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন। আমি তাঁকে পদত্যাগ করতে বলব না, উনি নিজে সরে গেলে সমস্যা নেই।’

এরপর ২০ মে সৈয়দ আহসানুল আলমসহ ৭ পরিচালক স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৩ মে পরিচালনা পর্ষদের সভায় ব্যাংকের শীর্ষ পদ থেকে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সভায় পরিচালকবৃন্দ বলেন, হুমকির মুখে যদি কোনো পরিচালককে পদত্যাগ করানো যায়, তবে একের পর এক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের পরিচালকদের বিদায় নিতে হবে। হুমকির মাধ্যমে কোনো পরিচালককে পদত্যাগ করানোর চেষ্টা করা হলে অনেক পরিচালক একযোগে পদত্যাগ করবেন। বিজ্ঞপ্তিতে সাক্ষর করেন, শেয়ারহোল্ডার পরিচালক আব্দুল মতিন, বোরহান উদ্দিন আহমেদ ও কাজী শহিদুল আলম। বাকিরা হলেন স্বতন্ত্র পরিচালক আবদুল মাবুদ, সাইফুল ইসলাম ও হেলাল আহমেদ চৌধুরী।

এদিকে ইসলামী ব্যাংকে এমন পরিবর্তনের কারণে এর বিদেশী েউদ্যোক্তারা সিংহ ভাগ শেয়ার বিক্রি করছেন। যার বেশির ভাগ কিনেছে ব্যাংকটির বড় গ্রাহক এস আলম গ্রুপ।

শেয়ারবাজারনিউজ/আ

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top