মিউচ্যুয়াল ফান্ড: বেশি কমিশনের আশায় বিনিয়োগকারীর ক্ষতি করবেন না

Editorialবাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা সংশোধন করে অ্যাসেট ম্যানেজারদের ডিভিডেন্ড হিসেবে রি-ইনভেষ্টমেন্ট বা স্টক ডিভিডেন্ড দেয়ার রাস্তা খুলে দিয়েছে। সেই সুযোগে অ্যাসেট ম্যানেজাররাও রি-ইনভেষ্টমেন্ট ইউনিট (আরআইইউ) প্রদানে কোনো কৃপণতা করছে না। কিন্তু তাদের এই স্টক ডিভিডেন্ড দেয়ার ফলে দিনের পর দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

ধরা যাক, ২০০ কোটি টাকার কোনো মিউচ্যুয়াল ফান্ড গঠন করা হলো। গঠিত এ ফান্ডের ১% কমিশন হিসেবে ২ কোটি টাকা কমিশন পাচ্ছেন সম্পদ ব্যবস্থাপক। যদি এই ২০ কোটি ইউনিটের বিপরীতে ১০ শতাংশ রি-ইনভেষ্টমেন্ট ইউনিট দেয়া হয় তাহলে মোট ইউনিটের সংখ্যা আরো ২ কোটি বেড়ে দাঁড়ায় ২২ কোটি ইউনিটে। এখন এই ২২ কোটি ইউনিটের বিপরীতে ১% কমিশন নিচ্ছেন সম্পদ ব্যবস্থাপকরা। অর্থাৎ যত স্টক ডিভিডেন্ড দেবে অ্যাসেট ম্যানেজারদের কমিশন তত বৃদ্ধি পাবে।

কিন্তু এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কি পাচ্ছে? ১০ টাকায় ইউনিট কিনেও ফেসভ্যালু ও নেট অ্যাসেট ভ্যালুর (ন্যাভ) নিচে বাজার দর অবস্থান করছে। মিউচ্যুয়াল ফান্ড এর প্রতি বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হলেই এর দাম ন্যাভ (Net Asset Value) এর উপরে থাকবে। আর বিনিয়োগকারীকে ভাল লভ্যাংশ প্রদান ব্যাতিরেকে তা সম্ভব নয়। আর বাজার মূল্য ন্যাভ এর নিচে থাকলে কেউই স্পন্সর হিসাবে নতুন মিউচ্যুয়াল ফান্ডের স্পন্সর হিসাবে বিনিয়োগ করবে না সেটাই স্বাভাবিক।

তাই বেশি কমিশন পাবার আশায় স্টক ডিভিডেন্ড বা রি-ইনভেষ্টমেন্ট ইউনিটের নামে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন।

বর্তমানে বাজারে ৩৫টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড পরিচালনা করছে বিভিন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রেস ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। এই সম্পদ ব্যবস্থাপক বোধহয় প্রতিজ্ঞাই করে বসেছে যে তারা কখনো ক্যাশ দেবে না। কারণ বিধিমালা সংশোধনের পর এর পরিচালিত ১০টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের কোনোটির ঝুলিতেই ক্যাশ ডিভিডেন্ড নেই। তাদের পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ডগুলো হলো: ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচ্যুয়াল ফান্ড (গত তিন বছর ধরে RIU দিচ্ছে), এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড (গত চার বছর ধরে RIU দিচ্ছে), ইবিএল ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড (গত দুই বছর ধরে RIU দিচ্ছে), ইবিএল এনআরবি মিউচ্যুয়াল ফান্ড (গত চার বছর ধরে RIU দিচ্ছে), এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড (গত তিন বছর ধরে RIU দিচ্ছে), ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড (গত চার বছর ধরে RIU দিচ্ছে), আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড (গত চার বছর ধরে RIU দিচ্ছে), পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড (গত চার বছর ধরে RIU দিচ্ছে) , পিএইচপি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড ((গত তিন বছর ধরে RIU দিচ্ছে) এবং ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড (গত চার বছর ধরে RIU দিচ্ছে)।

বিধিমালা সংশোধনের পর আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, ভেনগার্ড, এলআর গ্লোবাল, ভিআইপিবি, এইমস অব বাংলাদেশ তারাও চাইলে রি-ইনভেষ্টমেন্ট দিতে পারতো। কিন্তু তারা বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেনি। কিছুক্ষেত্রে RIU দিলেও সঙ্গে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে।

যেকোন দেশের পুঁজিবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বাজারকে শক্তিশালী করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। সাধারণ বিনিয়োগকারী, পেনশন হোল্ডারস, গৃহিনী যারা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করার চেয়ে পেশাদার ফান্ড ম্যানেজার কর্তৃক পরিচালিত মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করে বছর শেষে ভাল লভ্যাংশ পায়।

আর আমাদের দেশের মিউচ্যুয়াল ফান্ডের অবস্থা ঠিক বিপরীত। মিউচ্যুয়াল ফান্ড বাজারকে কোনভাবেই প্রভাবিত করতে পারছে না। সামগ্রিক বাজার মূলধন, লেনদেনে এর অংশ খুবই কম। এর কোন চাহিদা বিনিয়োগকারীর নিকট নেই। তাই মিউচ্যুয়াল ফান্ড, নেট অ্যাসেট ভ্যালুর ৫০% পর্যন্ত কমে বিক্রি হচ্ছে। অথচ বাজারকে শক্তিশালী করতে হলে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে জনপ্রিয় করার কোন বিকল্প নাই।

বিষয়টি যে বিএসইসি কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করতে পারছে না তা নয়। তবে ভুক্তভোগিদের অভিযোগ, বিএসইসি বিনিয়োগকারীর স্বার্থ না দেখে কতিপয় ফান্ড ম্যানেজারদের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে। ফান্ড ম্যানেজাররা যাতে ফান্ডের আকৃতি বৃদ্ধির মাধ্যমে কমিশন বেশী পায় তার সুযোগ করে দিচ্ছে বিএসইসি।

কিন্তু এসব দেখার দায়িত্ব রেগুলেটরি বডি হিসাবে বিএসইসির। দুর্ভাগ্য যে, অন্য সকল সেক্টরের ন্যায় এখানে কোন জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার কথা আসছে না।

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

One Comment;

*

*

Top