হতাশ বিএসইসি আইপিও গতি ফেরাতে পথ খুঁজছে

BSECশেয়ারবাজার রিপোর্ট: শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে (আইপিও) অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের পাশাপাশি নানান ধরণের ঝামেলা পোহাতে হয়। বিশেষত বুকবিল্ডিং এর ক্ষেত্রে তো সময় এবং জটিলতার কোন বালাই নেই। এতে যে উদ্দেশ্যে টাকা সংগ্রহের জন্য কোম্পানিগুলো আসে সে উদ্দেশ্যটিই ব্যহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পরিণতিতে অনেক ভাল ভাল কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি হতে এসে ফেরত গিয়েছে। আর আইপিও’র এমন দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে হতাশ কমিশনও।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একজন কমিশনার এ বিষয়ে শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে বলেন, আমাদের এখানে আইপিও কার্যক্রম পরিচালনায় অহেতুক সময় ব্যয় হয়। এ নিয়ে কমিশন সভাগুলোতেও বিভিন্ন বার হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বের অন্য কোথাও আইপিও-তে এতো সময় ব্যয় হয় না। তাই আইপিও কার্যক্রমে গতি আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তা করছে কমিশন।

কমিশনার বলেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে আইপিও’র কার্যক্রম কিভাবে পরিচালিত হবে আইনেই তা নির্দিষ্ট করে বলা আছে। আর বিষয়গুলো এতো জটিলও নয় যে বেশি সময়ের প্রয়োজন। তারপরও বেশি সময় লাগছে যা অত্যন্ত হতাশাজনক। এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছে কমিশন। বর্তমানে আইপিও কার্যক্রম ডিজিটালাইজ করার কথা চলছে। এতে গতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এখনও কোন কিছু চূড়ান্ত হয়নি। আর এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে।

বেশ কিছু কোম্পানি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হতে রোড শো করেছে এবং প্রসপেক্টাস জমা দিয়েছে এক বছরেরও উপর হয়েছে। ‍ওই সব কোম্পানিতে গিয়ে দেখা গেছে তারা স্থাপনা তৈরি করে বসে আছে। কিন্তু টাকার অভাবে যন্ত্রপাতি স্থাপন করে কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না। অথচ ব্যাংকের মাধ্যমে অনেক আগেই কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল। এ প্রসঙ্গে কমিশনার বলেন, আমাদের কাছেও বিভিন্ন সময়ে অনেক উদ্যোক্তা অভিযোগ করেছেন। আইপিও-তে অনেক ডিসক্লোজার জমা দিতে হয়। কিন্তু সেগুলো ছকে বাধা। এতে এমন জটিলতাও নেই। কমিশনের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বারবার বলা হয়েছে কোন কোম্পানির ডিসক্লোজার আইন সম্মত না হলে নাকচ করে দিন। তারা (কোম্পানি) পুনরায় করে নিয়ে আসুক। কিন্তু তাদের ঝুলিয়ে রাখার কোন অর্থ হয় না।

এদিকে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিও তে তালিকাভুক্ত হতে রোড শো সম্পন্ন করা কয়েকটি কোম্পানির চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলাপকালে তারা শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমের প্রতিবেদককে বলেন, বিএসইসি’র বিরুদ্ধে তারা কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করবেন না। তবে তারা বলেন, দেশিও বাজারে চাহিদা থাকায় আমরা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চেয়েছি। এর জন্য অর্থ সংগ্রহে রোড শো করা হয়েছে। ইস্যু ম্যানেজার এবং আমাদের কোম্পানির লোকজন এখনও এ বিষয়ে কাজ করছে। অথচ এক বছর হয়ে গেলেও অনুমোদন তো দূরের কথা আমাদের ইস্যুটি কি পর্যায়ে রয়েছে তাই ঠিকভাবে জানা যাচ্ছে না। যেহেতু আইপিও ইস্যুতে ইতিমধ্যে বেশকিছু টাকা খরচ হয়েছে তাই এখনতো পিছিয়েও আসা যাচ্ছে না। দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে আর কতো সময় লাগবে সেটা সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা নেই। আমাদের কথা হচ্ছে ব্যবসা নিয়ে কমিশনের কোন সন্দেহ থাকলে তারা সরেজমিনে আমাদের কার্যক্রম দেখে যাক। আমরা তো তাদের চাহিদা অনুযায়ী যা করা দরকার তাই করতে প্রস্তুত।

ভুক্তভোগী এক কোম্পানির চেয়ারম্যান বলেন, আমরা হাসপাতালের মাধ্যমে মানুষকে সেবা দিই। আমাদের কার্যক্রমের সঙ্গে মানুষের জীবন মরণ জড়িত। তাই চাহিদানুযায়ী বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হচ্ছে। এতে এসব রোগের চিকিৎসা বিদেশে না গিয়ে দেশেই করা সম্ভব ছিল। তাছাড়া বিদেশে যাওয়ার সামর্থ সবার থাকেও না। এর জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে চেয়েছিলাম। রোড শোও করেছি। কিন্তু বছর পার হয়ে গেলেও এর কোন অগ্রগতি নেই। এদিকে আমাদের রোগীরা চিকিৎসার জন্য বসে আছে। আইপিও ইস্যুতে আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে।

প্রিমিয়ামসহ শেয়ারবাজারে আসতে চাইলে পাবলিক ইস্যু রুলস-২০১৫’তে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই পাবলিক ইস্যু রুলস জারি করা হয়েছে। এরই আলোকে বেশ কিছু কোম্পানি ‘রোড শো’ সম্পন্ন করেছে। তবে এ পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি কোম্পানি বিডিংয়ের অনুমোদন পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় ১০ মাস।

‘রোড শো’ সম্পন্ন করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে – ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল অ্যাপোলো হাসপাতাল ‘রোড শো’ সম্পন্ন করেছে। এ ছাড়া একই বছরের ১২ এপ্রিল আমরা নেটওয়ার্ক, ৩০ জুন বসুন্ধরা পেপার মিলস, ৯ অক্টোবর বেঙ্গলপলি অ্যান্ড পেপার স্যাক লিমিটেড, ১৯ অক্টোবর রানার অটোমোবাইলস, ২৪ অক্টোবর পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস, ৬ অক্টোবর ডেল্টা হসপিটাল, ১৮ অক্টোবর ইনডেক্স অ্যাগ্রো ইন্ডাষ্ট্রিজ এবং চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল এ্যাস্কয়ার নিট কোম্পোজিট ‘রোড শো’ সম্পন্ন করেছে।

ব্যবসায় সম্প্রসারণের লক্ষে অ্যাপোলো হাসপাতাল শেয়ারবাজার থেকে ৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। এ ক্ষেত্রে ৪ এপ্রিল ‘রোড শো’ আয়োজন করে। এ ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের ব্যবসায়িক চিত্র তুলে ধরা হয়। ‘রোড শো’র পরে ১৫ মাস পার হতে চললেও বিডিংয়ের অনুমোদন পায়নি।

বসুন্ধরা পেপার মিলস ২০০ কোটি টাকা উত্তোলনের লক্ষে ‘রোড শো’ করেছে। কারখানার আধুনিকায়ন ও মেশিনারি আমদানি করার লক্ষে এ টাকা সংগ্রহ করতে চায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির ‘রোড শো’তে ২০১৬ সালের (জানুয়ারি-মার্চ) সময়ের ব্যবসায়িক অবস্থা তুলে ধরা হয়।

চিকিৎসা সেবা বাড়ানোর লক্ষে ব্যবসায় সম্প্রসারণ ও ঋণ পরিশোধ করার লক্ষে শেয়ারবাজার থেকে ৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায় ডেল্টা হসপিটাল কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষে ৬ অক্টোবর ‘রোড শো’ আয়োজন করা হলেও এখনো বিডিংয়ের অনুমোদন পায়নি।

ব্যবসায় সম্প্রসারণের লক্ষে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করার লক্ষে ‘রোড শো’ সম্পন্ন করেছে ১৮ এপ্রিল এ্যাস্কয়ার নিট কোম্পোজিট।

এ প্রসঙ্গে কোম্পানিগুলোর কোম্পানি সেক্রেটারিদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, আইপিও’র কারণে আমাদের কোম্পানিগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন করতে হয়েছে। এতে অনেকেই পরিচালক পদ হারিয়েছেন। তারা আজ আমাদের কটাক্ষ করছেন। তাছাড়া আইপিও’র জন্য কোম্পানি গত দুই বছর ধরে ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারছে না। আইপিও ইস্যুতে কমিশন যেসব ডিসক্লোজার চেয়েছে সবই জমা দিয়েছি। তারপরও কোন অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। প্রতি পর্ষদ সভায় পরিচালকদের বিষয়গুলো আমাদের বুঝিয়ে বলতে হয়।

ইস্যু ম্যানেজাররা ক্ষোভের সাথে বলেন, জিডিপি-তে পুঁজিবাজারের অংশগ্রহণ বাড়াতে যে লক্ষমাত্রা রয়েছে। এভাবে চললে তা কোনদিনই পুরণ হবে না। বরং যারা (ইস্যু ম্যানেজার) আইপিও নিয়ে কাজ করছে তারাই আজ সঙ্কটে রয়েছে।

শেয়ারবাজারনিউজ/আ

 

আপনার মন্তব্য

Top