বুকের ব্যথার কারণ হৃদরোগ!

বুকের ব্যথাশেয়ারবাজার ডেস্ক: প্রায়ই শুনা যায়  অমুকের হার্ট ব্লক হয়েছে বা হার্ট স্ট্রোক করেছে। হার্ট ব্লক বা স্ট্রোক যে নামেই ডাকা  হোক না কেন তা আসলে এক ধরনের হৃদরোগ। আর এই হৃদরোগের কারণ হলো হৃদযন্ত্রের ভেতরের এক বা একাধিক ধমনী ব্লক বা বন্ধ হয়ে যাওয়া। ব্লক প্রচলিত শব্দটি কিন্তু এই রোগের ক্ষেত্রে ভুল নামকরণের শিকার। কারণ হার্ট ব্লক নামে সত্যিই এক ধরনের হৃদরোগ আছে, যে ক্ষেত্রে হার্টের স্পন্দন বা রিদম জড়িত। ধমনী বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। আবার হার্ট অ্যাটাক রোগটিকেও ভুলবশত স্ট্রোক বলা হয়ে থাকে। স্ট্রোক মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ জাতীয় রোগ আর হার্ট অ্যাটাক হৃৎপিণ্ডের একটি রোগ, যার মেডিক্যাল পরিভাষা হলো মায়কার্ডিয়াল ইনফার্কশন, ছোট্ট করে একে বলা হয় এমআই।

ধমনীর ব্লক আসলে কি হৃৎপিণ্ড শরীরের সর্বত্র রক্ত সরবরাহ করে, এই প্রবাহিত রক্তের কাজ খুব সহজ করে বললে হবে সর্বত্র পুষ্টির জোগান দেওয়া। এটা যদি শতকরা ৫০ ভাগের বেশি হয়ে যায় সেক্ষেত্রে হৃদপিণ্ডের রক্তপ্রবাহ মাত্রাতিরিক্ত কমে যেতে থাকে এবং রোগী সামান্য পরিশ্রমেই বুকে ব্যথা অনুভব করতে পারেন।

হার্ট অ্যাটাক বা এমআই: হার্টের ধমনীগুলো সরু বা বন্ধ হয়ে গেলে রক্তপ্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যায় এবং হার্টের কোষগুলো মৃত্যু বা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয় এরই নাম ইশকেমিয়া। কেতাবি নাম মায়কার্ডিয়াল ইশকেমিয়া। ইশকেমিয়া হলে বুকে তীব্র চাপ ও ব্যথা অনুভূত হয়, তখন এই সমস্যাটিকে বলে এনজাইনা পেক্টোরিস। যদি ইশকেমিয়া চলতেই থাকে তাহলে হার্টের কোষগুলো এক সময় মারা যায়, এই অবস্থাটির নামই মায়কার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা এমআই_ যা আমরা প্রচলিত অর্থে হার্ট অ্যাটাক হিসেবে অভিহিত করে থাকি।

হার্ট অ্যাটাকজনিত বুকে ব্যথার লক্ষণ: ইশকেমিয়া হলে রোগীর বুকের বাম দিকে প্রচণ্ড ব্যথা বা এনজাইনা হয় এবং রোগী বুকের মাঝখানে তীব্র চাপ অনুভব করে। অনেক রোগীই অভিযোগ করেন, তার বুকের ওপর ভীষণ ভারী একটা কিছু চেপে বসে আছে। ব্যথার তীব্রতা বুকে বেশি থাকলেও এটা বুক থেকে গলা, গাল, মাড়ি, কান, বাম হাত এবং আশপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একে রেফার্ড পেইন বলা হয়। বুকের ব্যথা ১ থেকে ৩ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, তবে এটা কখনই ৩০ সেকেন্ড সময়ের কম হয় না। ডায়াবেটিস রোগীরা নার্ভের সমস্যার কারণে আবার এ ব্যথা ঠিকমতো নাও বুঝতে পারে। এনজাইনা বা ব্যথা শুরু হয় সাধারণত কোনো একটা পরিশ্রমের কাজ করার সময় যেমন দৌড়ানো বা জোরে হাঁটা ইত্যাদি। তবে পেট ভরে খাবার খাওয়া, যৌনক্রিয়া এমনকি হঠাৎ রেগে যাওয়া বা উত্তেজিত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ও এনজাইনা শুরু হয়ে যেতে পারে। ব্যথার সঙ্গে রোগীর অন্য উপসর্গ যেমন শ্বাসকষ্ট, পেট ফাঁপা লাগা, অস্থির লাগা, বুক ধড়ফড় করা ইত্যাদিও থাকতে পারে। পরিশ্রম বন্ধ করে বিশ্রাম নিলে এই ব্যথা সঙ্গে সঙ্গে সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে।

রোগ নির্ণয়: এনজাইনা বা এমআইর কারণে বুকে ব্যথা শনাক্ত করতে হলে প্রথম যে পরীক্ষাটি করা হয় তা হলো ইসিজি। ব্যথার শুরুর দিকে ইসিজি স্বাভাবিকও আসতে পারে, এজন্য পর্যায়ক্রমে বেশ কয়েকবার ইসিজি করা লাগতে পারে। এরপরও যদি ইসিজি স্বাভাবিক আসে এবং এনজাইনা হওয়ার সন্দেহ থাকে সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হার্টের এনজাইমের মাত্রা দেখে এই রোগ নিশ্চিত করেন। প্রধানত ট্রপনিন আই এবং সিকেএমবি এনজাইম দুটো দেখা হয়। এ ছাড়া অন্য এনজাইম ও দেখার প্রয়োজন হতে পারে। কোনো কোনো রোগী আছেন যাদের মাঝে মাঝে কাজের মধ্যে বুকে ব্যথা হয় কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় হয় না এবং ইসিজি করলেও ধরা পড়ে না তাদের ক্ষেত্রে স্ট্রেস টেস্ট বা ইটিটি পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করতে হয়। স্ট্রেস টেস্ট যেমন ইটিটি, ডবুটামিন স্ট্রেস টেস্ট এসব পরীক্ষা করেও রোগ ধরা সম্ভব না হলে, চূড়ান্ত পরীক্ষা হলো হার্টের এনজিওগ্রাম। সিটি স্ক্যান করে (সিটি এনজিওগ্রাম) অথবা পা কিংবা হাতের ধমনীতে বিশেষ ধরনের ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে দু’ভাবেই এনজিওগ্রাম করা যায়। তবে শেষের পদ্ধতিই বেশি কার্যকর।

চিকিৎসা: করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা ইশকেমিক হার্ট ডিজিজের চিকিৎসা অবশ্যই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের (কার্ডিওলজিস্ট) তত্ত্বাবধানে করা উচিত। এর কোনো বিকল্প নেই। কারণ কেবল হৃদরোগ বিশেষজ্ঞই রোগীর সঠিক অবস্থা বিবেচনা করে আদর্শ চিকিৎসা দিতে পারেন। সহজ করে বললে এনজাইনা জাতীয় রোগে তারা প্রথমেই যে ওষুধগুলো দিয়ে থাকেন তার মধ্যে একটি হলো নাইট্রোগ্গি্নসারিন যা স্প্রে করে, শিরায় অথবা ট্যাবলেট হিসেবেও দেওয়া হয়। এ ছাড়াও রক্তের প্লাটেলেট বা অনুচক্রিকা প্রতিরোধক এসপিরিন বা ক্লোপিডোগেল, উচ্চরক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ বেটাব্লকার, মরফিন জাতীয় শক্তিশালী ব্যথানাশক এবং রক্ত তরলকারী হেপারিন বা ইনোক্সাপারিনও দেওয়া হয়। কার্ডিওলজিস্ট অনেক সময় রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে রক্ত তরলকারী ইনজেকশন স্ট্রেপটোকাইনেজ বা এল্টেপ্লাজ জাতীয় ওষুধও ব্যবহার করে থাকেন। তবে ইশকেমিক হার্ট ডিজিজের চূড়ান্ত চিকিৎসা হলো প্রথমে এনজিওগ্রাম করে কোনো ধমনীতে স্টেনোসিস আছে তা নির্ণয় করা এবং সেই অনুযায়ী এনজিওপ্লাস্টি করা বা ব্লক সরিয়ে সে স্থানে স্টেন্ট বসিয়ে দেওয়া, যা রিং পরানো নামে অধিক পরিচিত। অনেক সময়ই স্টেন্ট বসানো সম্ভব হয় না অথবা যৌক্তিক হয় না সেক্ষেত্রে অবশ্যই সিএবিজি বা বাইপাস অপারেশন করে রোগীকে স্থায়ীভাবে চিকিৎসা করা হয়।

শেয়ারবাজারনিউজ/রা

আপনার মন্তব্য

Top