পুঁজিবাজারে আসছে আমূল পরিবর্তন: আরেকটি প্রত্যাশার বছর শুরু

২০১৭ সালের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির তেমনটা ব্যবধান ছিলো না। সূচক,দৈনিক লেনদেন,বাজার মূলধন সবকিছুতেই যেন রেকর্ডের ছোঁয়া ছিলো। দুই হাজার কোটির ওপর দৈনিক লেনদেন, সূচক ৬ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম, ৪ লাখ কোটি টাকায় বাজার মূলধনের অবস্থান ইত্যাদি ইতিবাচক নির্দেশকগুলো সামনের বাজারকে আরো এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে। তবে ২০১৮ সালে পুঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসছে। আর এই পরিবর্তনগুলো বাজার বান্ধব হবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলেই।

২০১৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেন, কমিশনার মো: আমজাদ হোসেন এবং প্রফেসর ড. হেলাল উদ্দিন নিজামীর নিয়োগের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। যেহেতু দ্বিতীয়বার তাদের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ নেই তাই পরবর্তী বিএসইসির চেয়ারম্যান কে হবেন অথবা সরকার যাকে নিয়োগ দেবেন তিনি মার্কেটের জন্য কতটুকু ফলপ্রসু হবেন তা নিয়ে উদ্বিগ্নতার শেষ নেই। কারণ ২০১১ সাল থেকে বর্তমান বিএসইসির চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে মার্কেট একটি স্ট্যাবল জায়গায় এসে পৌছেছে। এমতাবস্থায় নতুন কারো আগমনে আবার বিপরীত আচরণ করে কিনা সে ভয়ও রয়েছে। তবে সরকার চাইলে আইন সংশোধন করে বিদ্যমান চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পুনরায় নিয়োগ দিতে পারেন।

২০১৮ সালে আরো একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছে কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোডস্। আগের গাইডলাইনের অনেকটা সংশোধন করে কোম্পানিগুলোর ভেতর বাহির স্বচ্ছতা আনয়নে এই কোডস্ কাজ করবে। এই কোডসে্র আওতায় প্রতিটি কোম্পানির পর্ষদ সদস্যদের শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতে কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। পর্ষদে সব সদস্য বিদেশি হতে পারবে না। পর্ষদে কমপক্ষে একজন মহিলা সদস্য থাকবেন। এছাড়া পর্ষদের প্রতি ১০ জনে একজনের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে হতে হবে। পর্ষদ সম্মিলিতভাবে বিএসইসির নির্ধারণ করা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সর্বনিম্ন শেয়ার শতাংশ ধারণ করবে এবং সদস্যরাও সর্বনিম্ন শেয়ার শতাংশ ধারণ করবে। নমিনি পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ৫ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে।

আরো একটি উল্লেখ বিষয় হচ্ছে এই কোডস্ যখন গেজেটের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা হবে তখন কোন কোম্পানি স্টক ডিভিডেন্ড দিলে এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে হবে। পাশাপাশি স্টকের টাকা দিয়ে কী করা হবে তার বিস্তারিত প্রতিবেদন শেয়ারহোল্ডারদের জানাতে হবে। এছাড়া কোম্পানির সুশাসন নিশ্চিতের জন্য পর্ষদ কমপক্ষে পাঁচটি সাব-কমিটি গঠন করার পাশাপাশি প্রান্তিক ও বাৎষরিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে টাইটের মধ্যে থাকতে হবে।

এদিকে সদ্য চালু হওয়া ২০১৮ সালের যেকোনো সময়েই ব্যাংক কোম্পানি আইন প্রণয়ন করা হতে পারে। এ আইন প্রয়োগ করা হলে ব্যাংক কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে পরিবারতন্ত্র বিরাজ করবে। যদিও বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ কোম্পানিই পরিবার তান্ত্রিক তবে ব্যাংক,বীমা ও নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর থেকে একটু বাইরে রয়েছে। কিন্তু সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন প্রয়োগ করা হলে একই পরিবারের ৪ জন সদস্য টানা ৯ বছর পরিচালক পদে থাকতে পারবেন। যেহেতু দেশে বিদ্যমান ৪১টি দেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৩০টিই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে। তাই বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের যথেষ্ট চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে ২০১৮ সালে যাই ঘটুক না কেন পুঁজিবাজার তার নিজের তালেই এগিয়ে যাবে। ২০১০-১১ সালের বাজার ধসের পর বিগত ৭ বছরে একটি স্থিতিশীল জায়গায় পুঁজিবাজারে এসে পৌছেছে। ভারতের পুঁজিবাজারের সেনসেক্স যেমন একের পর একটি রেকর্ড করে বিনিয়োগকারীদের মুখে হাসি ফুটিয়ে যাচ্ছে। তেমনি আগামীর পুঁজিবাজার গতিশীল হয়ে এদেশের বিনিয়োগকারীদের মুখেও হাসি ফোঁটাবে। এখনো ইনকাম ট্যাক্সের আইনসহ বিভিন্ন আইনে পুঁজিবাজারের ব্যবসাকে speculation বা ফটকা ব্যবসা হিসেবে অবহিত করা হয়েছে। আর এই “ফটকা” শব্দটি থেকে বের হয়ে শুধুমাত্র ব্যবসায়ী হিসেবে বিনিয়োগকারীরা যেন নিজেদের পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন সেই প্রত্যাশায় শুরু হোক ২০১৮ সালের যাত্রা।

 

 

আপনার মন্তব্য

*

*

Top