বাজারের স্থিতিশীলতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাদের মধ্যে সমন্বয় জরুরী

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরী। দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে তাদের সম্মিলিত ভাবে কাজ করতে হবে।

গতকাল বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) এর প্রেসিডেন্ট নাসির উদ্দীন চৌধুরী এসব কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, সমন্বয়হীনতার কারণে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে এর সমাধানে আমরা ও ডিবিএ সমন্বয় করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসিকে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেওয়া হবে।

এই সময় ডিবিএ প্রেসিডেন্ট মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, এসব সমস্যা সমাধানে সমন্বয়ের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়কেও জানানো হবে।

গতকাল বাংলাদেশ বিএমবিএ, ডিবিএ এবং শীর্ষস্থানীয় ৩০ ব্রোকারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সভায় বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বাজারে পতনের আরেক কারন হিসেবে গুজোব ও আতঙ্ককেও দায়ী করা হয়।

বিএমবিএর প্রেসিডেন্ট বলেন, পুঁজিবাজারে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজারমূল্য বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এতে শেয়ারের মূল্য বেড়ে গেলেই এক্সপোজারসীমা বেড়ে যায়। তখন শেয়ার বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা বাড়লে সেটি বাজারের জন্য ভালো। এতে দুঃসময় তারা বাজারকে সাপোর্ট দিতে পারবে। এজন্য আমরা পুঁজিবাজার বিনিয়োগসীমা হিসাব করার ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের বদলে ক্রয়মূল্যকে বিবেচনা করার দাবি জানাচ্ছি। যেহেতু শেয়ারের মূল্য বাড়ার কারণে যে লাভ হয়, সেটি ব্যালান্সশিটে যোগ করা হচ্ছে না, তাই এক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকিও নেই। আমাদের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অনুরোধ থাকবে বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য।

বন্ড, ডিবেঞ্চার, প্রেফারেন্স শেয়ারসহ অতালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগকে পুঁজিবাজার বিনিয়োগসীমার আওতার বাইরে রাখারও দাবি জানাচ্ছি আমরা। এতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের পরিধি বাড়বে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আমরা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজার বিনিয়োগের যে প্রতিবেদন দিই, সেটি এতদিন মূল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দিয়ে আসছি। আমরা চাইছি এখন থেকে সেটি একক ভিত্তিতে দেয়ার জন্য। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়বে।

বিএমবিএর প্রেসিডেন্ট বলেন, এডি রেশিও নিয়ে বাজারে গুজোব রটানো হচ্ছে। অথচ এর সঙ্গে সরাসরি পুঁজিবাজার বিনিয়োগের সম্পর্ক নেই। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো তাদের মূলধনের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে থাকে। আর এডি রেশিওর বিষয়টি ব্যাংকের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সম্পর্কিত। আমানতের তুলনায় ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেলে সেখানে ভারসাম্য আনতেই এডি রেশিও কমানো হয়। এডি রেশিও ইস্যুটি বিনিয়োগকারীদের বাস্তব ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার আহ্বান জানাচ্ছি। বরং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের বড় একটি অংশ সঞ্চয়পত্রে চলে যাচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার একটা যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করার দাবি জানাচ্ছি।

বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের সংবেদনশীল তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে আমরা গুরুত্ব দিতে চাই। সামনে ইটিএফ মার্কেট মেকার আসবে। এজন্য তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ ধরনের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা রয়েছে কিনা সেটি যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। আমরা বিনিয়োগকারীকে তাদের তথ্যের নিরাপত্তা দিতে চাই।

মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর কাছে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল থাকলে আমরা অনুরোধ করব তাদেরকে বিনিয়োগ করার জন্য। এটিও বাজারের জন্য একটি সাপোর্ট হিসেবে কাজ করবে।

আরেকটি বিষয়, বিনিয়োগকারীদের সচেতন করে তোলার জন্য দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতিনিয়তই নতুন নতুন বিনিয়োগকারী আসছে। কিন্তু অবকাঠামোগত পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় এ কার্যক্রমে আমরা ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখতে পারছি না। তাই বিএসইসির কাছে আমাদের অনুরোধ, সিকিউরিটিজ হাউজগুলোকে নতুন শাখা খোলার অনুমোদন দিন। এতে করে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরো বিস্তৃত পরিসরে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

বিএমবিএর প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সভা করার বিষয়টিও আমরা চিন্তাভাবনা করছি। আর আমাদের উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো বিবেচনার জন্য বিএসইসি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।

ডিবিএর প্রেসিডেন্ট মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে পুঁজিবাজারে আইসিবিকে যেন দুর্বল করা না হয়। আইসিবির সক্ষমতা বাড়লে সেটি পুঁজিবাজারের জন্য ভালো। পুঁজিবাজারের স্বার্থে আমরা আইসিবিকে একক গ্রাহক ঋণসীমার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতির দাবি জানাচ্ছি। তাছাড়া মুদ্রাবাজারের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক বিএসইসির মধ্যে যথাযথ সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে গতকাল সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় দরপতনের মধ্য দিয়ে সপ্তাহের কেনাবেচা শুরু হয়েছে দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে। এদিন সকাল থেকেই বিক্রয়চাপে টানা নামতে থাকে সূচক। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্রড ইনডেক্স ডিএসইএক্স ১৩৩ দশমিক ১৫ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৮৮৮ দশমিক ২৯ পয়েন্টে নেমে যায় সূচকটি। ৩৬ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে ২ হাজার ১৯১ দশমিক ৫৯ পয়েন্টে নেমেছে স্টক এক্সচেঞ্জটির ব্লু-চিপ সূচক ডিএস৩০। ১৯ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে ১ হাজার ৩৭৭ দশমিক ২১ পয়েন্টে অবস্থান করছে শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস। স্টক এক্সচেঞ্জটিতে মাত্র ২৩টির দরবৃদ্ধির বিপরীতে দিন শেষে কমেছে ৩০২টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১১টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের বাজারদর।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/আ

আপনার মন্তব্য

Top