কম দরে ডিএসই’র মালিকানা পেতে ভারতের তোড়জোড়

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত মালিকানা নিয়ে চীনা ও ভারতীয় কনসোর্টিয়ামের মধ্যে জোর টানাটানি চলছে। আর্থিক, কারিগরি ও কৌশলগত বিবেচনায় শনিবারের সভায় চীনাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল স্টক এক্সচেঞ্জটির পর্ষদ। রেগুলেটরি অনুমোদনের জন্য রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে নিজেদের এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) অবহিত করার পরিকল্পনাও নিশ্চিত করেছিল ডিএসইর একাধিক সূত্র। তবে অনিবার্য কারণে গতকাল এ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র জমা দেয়া হয়নি।

ডিএসইতে কৌশলগত বিনিয়োগ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেন না। তবে ওয়াকিবহাল একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, দরপ্রস্তাবে পিছিয়ে পড়ার পর আরেক দফা দরকষাকষির জন্য অনির্ধারিত এক বৈঠকে গতকাল বিএসইসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (এনএসই) নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের একটি প্রতিনিধি দল। সেখানে এনএসইর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিক্রম মুকুন্দ লিময়ে, ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান প্যাট্রিক ব্রামার ও তার স্থানীয় অংশীদার খালিদ কাদির উপস্থিত ছিলেন। তারা ডিএসইর উন্নয়নে নিজেদের প্রস্তাবের গুরুত্ব সম্পর্কে কমিশনকে আরেক দফায় অবহিত করেছেন।

এরপর বিএসইসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান ডিএসইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কেএএম মাজেদুর রহমান। বিএসইসি চেয়ারম্যান ও সিংহভাগ কমিশনারের সঙ্গে এক বৈঠকে অংশ নেয়ার পর তারা ডিএসইতে ফিরে যান। বৈঠকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে তারা গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে সম্মত হননি।

তবে অবগত বেশ কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, কমিশন কর্মকর্তারা ডিএসই প্রতিনিধিদের উভয় পক্ষের প্রস্তাব আরো ভালোমতো বিশ্লেষণের পর সিদ্ধান্ত নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে মঙ্গলবার টেন্ডার বাক্স খোলার পর প্রাথমিক তথ্যাদি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে না জানানো, শনিবার কমিশন বন্ধ থাকার দিনে পর্ষদ সভা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো প্রক্রিয়াগত কিছু বিষয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে কমিশন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আজ কৌশলগত বিনিয়োগ সম্পর্কে আরো আলোচনার জন্য পরিচালকদের সভা আহ্বান করেছে ডিএসই।

উভয় কনসোর্টিয়ামের মনোভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষিত ডিএসইর এক-চতুর্থাংশ শেয়ার পেতে দুই পক্ষই সমান আগ্রহী। নিজ নিজ বলয়ে তারা তাদের প্রস্তাবের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবসংবলিত টেন্ডার বাক্স উন্মোচন করে ডিএসই। সেখানে দেখা যায়, প্রায় ১ হাজার কোটি টাকায় দেশের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জটির এক-চতুর্থাংশ শেয়ার কিনতে চায় শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের যৌথ কনসোর্টিয়াম। কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে ডিএসইর প্রতি শেয়ারের জন্য তারা দরপ্রস্তাব করে ২২ টাকা। এ হিসাবে তারা ডিএসইর ১৮০ কোটি শেয়ারের এক-চতুর্থাংশ বা ৪৫ কোটি শেয়ারের জন্য প্রায় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। পর্ষদে তাদের একজন পরিচালক রাখার প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাব অনুসারে, কৌশলগত অংশীদার হতে পারলে এ বিনিয়োগকারীরা ১০ বছর ডিএসইকে প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহায়তা দেবেন, যার আর্থিক মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

বিপরীতে প্রায় একই পরিমাণ শেয়ার কেনার জন্য ১৫ টাকা হারে দরপ্রস্তাব করে ভারতীয় ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (এনএসই) নেতৃত্বাধীন বিনিয়োগকারীদের আরেকটি কনসোর্টিয়াম। সেখানে ইকুইটি পার্টনার হিসেবে রয়েছে ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স পরিচালিত প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড ফ্রন্টিয়ার ফান্ড বাংলাদেশ এলএলপি আর টেকনোলজিক্যাল পার্টনার হিসেবে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সচেঞ্জ জায়ান্ট নাসডাক। এ গ্রুপটি ডিএসইর ২৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ শেয়ারের জন্য ১৫ টাকা হারে দরপ্রস্তাব করে। তাদের কাছ থেকে ডিএসই ৬৭৫ কোটি টাকার কিছু বেশি পেতে পারে, যা চীনাদের প্রস্তাবিত দরের চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম।

ডিএসই কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, আর্থিক, প্রযুক্তি ও কৌশলগত উভয় বিবেচনায় চীনা কনসোর্টিয়ামটির প্রস্তাব তুলনামূলক বেশি আকর্ষণীয়। দক্ষিণ এশিয়ায় তারা এরই মধ্যে পাকিস্তানের স্টক এক্সচেঞ্জে কৌশলগত বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে ভারতীয় এনএসইর অর্ধেক শেয়ার উন্নত বিশ্বের নামিদামি সব বিনিয়োগ ব্যাংকের হাতে। ভারতে খুব কম সময়ে এক্সচেঞ্জ ব্যবসা সম্প্রসারণ করা, ডেরিভেটিভ লেনদেন জনপ্রিয় করে তারা আলোচনায় এসেছে।

উল্লেখ্য, ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন, ২০১৩ অনুসারে মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথক করার পর স্টক এক্সচেঞ্জের ২৫ শতাংশ শেয়ার কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনক্রমে এ হার বাড়ানো যেতে পারে। কৌশলগত বিনিয়োগকারী বলতে আইনে সেসব প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়েছে, যারা ইকুইটি বা টেকনোলজিক্যাল পার্টনার হিসেবে পর্ষদে থেকে ডিএসইকে একটি আধুনিক এক্সচেঞ্জে উন্নীত করতে সাহায্য করবে। তাদের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেবেন নীতিনির্ধারকরা।

দেশের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জ ডিএসইর বর্তমান অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে ৪৫ কোটি শেয়ার বিক্রির বাধ্যবাধকতা আছে এক্সচেঞ্জটির।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত বছরের ১ জুন খোলা দরপত্রে ডিএসইর প্রতিটি শেয়ারের জন্য ৩০ টাকার বেশি দরপ্রস্তাব করেছিল লংকাবাংলা ফিন্যান্স ও ডেল্টা লাইফের নেতৃত্বাধীন একটি স্থানীয় কনসোর্টিয়াম। কারিগরি সমর্থনের জন্য তারা ভারতের বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। সে দফায় ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্সের নেতৃত্বাধীন বিদেশী কনসোর্টিয়ামটি ডিএসইর এক্সচেঞ্জ ব্যবসাটিকে আলাদা করে শুধু এর শেয়ার কেনার জন্য দরপ্রস্তাব করেছিল। তবে ডিএসইর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ও পর্ষদের অনিচ্ছায় কোনো প্রস্তাবই গৃহীত হয়নি। স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষের আবেদনক্রমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের কৌশলগত বিনিয়োগকারী খোঁজার জন্য আরেক দফা সময় বাড়িয়ে দেয়। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে কৌশলগত বিনিয়োগ চূড়ান্ত করতে হবে স্টক এক্সচেঞ্জটিকে।

একই আইনের বাধ্যবাধকতায় দেশের আরেক পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জও (সিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী খুঁজছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত চীনা কনসোর্টিয়াম ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আরেক দল বিনিয়োগকারীর সঙ্গে তাদের আলোচনা এগিয়েছে।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/আ

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top