বীমা খাতের সব অনৈতিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: দেশের বীমা খাতে গ্রাহক আস্থা ও ইমেজের সংকট রয়েছে। উন্নয়ন ও গ্রাহকের আস্তা বাড়াতে বীমা খাতের সব অনৈতিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছে বীমা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বীমা শিল্পের বর্তমান: বিরাজমান সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বিআইয়ের চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেনের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতি ছিলেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মো. শফিকুর রহমান পাটোয়ারী। এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মানিক চন্দ্র দে, সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, জীবন বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান ড. শেলীনা আফরোজা, আইডিআরএ’র সদস্য গকুল চাঁদ দাস ও বোরহান উদ্দিন, অ্যাকচুয়ারি ড. মোহাম্মদ সোহরাব উদ্দিন, বিআইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি রুবিনা হামিদ, সহ-সভাপতি একেএম মনিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এমডি জালালুল আজিম ও বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান তৌহিদ সামাদ প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইডিআরএর চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, বীমা গ্রাহকদের অনাস্থা দূর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে খাতটিতে কমিশন বাণিজ্যসহ অনৈতিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

শফিকুর রহমান আরো বলেন, আগে আইডিআরএর চেয়ারম্যান ও সদস্যরা বাইরে বের হতেন না। এখন আমরা বীমা কোম্পানির দাবির চেক দেয়ার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। এতে ভালো ফলও পাওয়া যাচ্ছে। ২০১৮ সালে খাতটিকে আরো গতিশীল করতে চাই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মানিক চন্দ্র দে বলেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো একটি আইনের খসড়া করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সেগুলো আইডিআরএতে পাঠানোর পর স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে অনেক সময় নষ্ট হয়। এতে সঠিক সময়ে সঠিক আইন করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।

তিনি আরো বলেন, সবকিছু মিলিয়ে বীমা খাতে যে সম্ভাবনা রয়েছে, তার সুফল পেতে হলে গতানুগতিক পণ্যের বাইরে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। মানুষের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর ওপর যদি বীমার পণ্য ডিজাইন করা যায়, তাহলে বীমার প্রচারে অনেক সহজ হবে।

আইডিআরএর সদস্য গকুল চাঁদ দাস বলেন, অতিরিক্ত কমিশন বাণিজ্যের সমাধান না করলে নতুন বাজার সৃষ্টি করে লাভ হবে না। সাধারণ বা জীবন বীমা উভয়ের জন্যই এটা প্রযোজ্য। তিনি বলেন, বীমা খাতে এজেন্টদের অতিরিক্ত কমিশন দেয়ার যে অনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে। এছাড়া এখনো বীমানীতি বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমরা বীমানীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব। প্রয়োজনে মন্ত্রণালয়ে নতুন করে সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করতে হবে। পাশাপাশি বেশকিছু আইনের পরিবর্তন করা যেতে পারে।

এসবিসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, বীমা খাতে আস্থার অভাব রয়েছে। তার কারণ একই ব্যক্তির কাছে পলিসির জন্য সব কোম্পানির লোকেরাই যায়। বীমা খাতের প্রসারে ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স চালুর দাবি জানিয়ে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, ফ্রান্স, জার্মানিতে বীমার মেজর অংশ হলো ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স, যা অনেকটা ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের মতো। এটি আমাদের দেশে চালু করতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

দেশের বীমা খাতে অধিকাংশ কোম্পানিই নতুন প্রডাক্ট ডিজাইনে গুরুত্ব দেয় না উল্লেখ করে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, কোম্পানিগুলোকে ইনোভেটিভ প্রডাক্ট, ই-প্রডাক্টসহ নতুন ও আকর্ষণীয় প্রডাক্ট বাজারে আনতে হবে। এছাড়া দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রচার থাকলেও ইসলামী বীমা সেভাবে জনপ্রিয় হয়নি। এর প্রসার বীমা খাতের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে হবে। এদিকে বিদেশী কোম্পানির সেবা নেয়ার জন্য মোটা অংকের পুনঃবীমা প্রিমিয়াম দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এটাও বন্ধ করা দরকার।

বিআইএর প্রথম সহসভাপতি রুবিনা হামিদ বলেন, জীবন বীমা কোম্পানির উন্নয়নে এজেন্ট দিয়ে বীমা পলিসি বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনে পলিসি বিক্রি করতে হবে। ব্যাংকাসুরেন্স (ব্যাংক গ্যারান্টিতে বীমা) বীমা বাধ্যতামূলক করা দরকার। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বীমা কোম্পানিতে নিয়মিত অডিট হচ্ছে না। আইডিআরএকে অন্তত দুই বছর পরপর অডিট করতে হবে। পাশাপাশি বীমা কোম্পানির এমডি গ্রাহকের টাকা যেন সঠিকভাবে দেখভাল করে, তা আইডিআরএকে তদারকি করতে হবে।

বিআইএর সহসভাপতি একেএম মনিরুল হক বলেন, দেশের অর্থনীতির তুলনায় বেশি বীমা কোম্পানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ফলে বীমা খাতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী বলেন, বীমা কোম্পানির এমডি নিয়োগে সর্বনিম্ন বয়স ৪০। এটা আরো কমানোর পাশাপাশি বীমা সম্পর্কে প্রচারণা বাড়ানো জরুরি।

শেয়ারবাজারনিউজ/এম.আর

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top