কাঁচামাল সংকটে অস্থির সিমেন্ট, বেড়েছে ব্যয়, অচলবস্থা দ্রুত কেটে যাবে: মাসুদ খান

দেশের স্বনামধন্য ও প্রথম সারির হিসাববিদ মাসুদ খান ১ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দেশিয় সিমেন্ট কোম্পানি এমআই সিমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। ৩৮ বছরেরও দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পিডব্লিউসি কলকাতা, মনরোভিয়া টোবাকো লাইবেরিয়া, বিএটি বিসি, লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট এর মতো স্বনামধন্য কোম্পানির শীর্ষপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ভারত থেকে আইসিএবি ও আইসএমএবি সনদ নিয়েছেন। বিশেষ করে আইসিএবি-তে সমগ্র ভারতে মেধাতালিকায় তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। এমআই সিমেন্টের সিইও’র দায়িত্বের পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস, গ্ল্যাক্সোস্মিথ ক্লাইন এবং ম্যারিকো বাংলাদেশের পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর জন্ম চট্টগ্রামে।এই লিজেন্ডের সঙ্গে সম্প্রতি নিয়ে শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমের খোলামেলা আলোচনা হয়। আলোচনার চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো:

শেয়ারবাজারনিউজ: আপনি দীর্ঘদিন ধরে সিমেন্ট খাত নিয়ে কাজ করছেন। এদেশে সিমেন্টের সম্ভাবনা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন?

মাসুদ খান: বাংলাদেশে মাথাপিছু সিমেন্টের গড় ব্যবহার ১৬৫ কিলোগ্রাম। বিশ্বব্যাপী মাথাপিছু সিমেন্টের গড় ব্যবহার ৫০০ কিলোগ্রাম। আর চীনে মাথাপিছু সিমেন্টের গড় ব্যবহার ১ টন। কাজেই দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে সিমেন্ট খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এ প্রবৃদ্ধি কিভাবে আসবে?

দ্রুত উন্নয়শীল দেশগুলোর মধ্যে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ হিসাবে বাংলাদেশ অন্যতম। এ প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বহু পরিমাণে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নত গৃহায়ন ও অন্যান্য পুর কাঠামো নির্মাণে যুক্তিসঙ্গত কারণেই সিমেন্টের চাহিদা বাড়ছে। তাই বাংলাদেশে বিগত দশকে ১০ শতাংশ হারে সিমেন্টের চাহিদা বাড়ছে। ইতোমধ্যে আমাদের দেশের সিমেন্ট খাত বিশ্বে ৪০তম বৃহৎ বলে পরিগণিত হচ্ছে।

শেয়ারবাজারনিউজ: সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের রাস্তাগুলো এখন বিটুমেনের পরিবর্তে কংক্রিটের (আরসিসি) করার ব্যবস্থা হচ্ছে। এতে সিমেন্টের ব্যবহার বহুগুন বাড়বে বলে আপনারা বলছেন। এ পদ্ধতিতে নির্মিত রাস্তার গুণগত মান কেমন হবে?

মাসুদ খান: বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই রাস্তার জন্য কংক্রিট ব্যবহার করা হয়। এতে প্রাথমিকভাবে খরচ বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই হওয়ার কারণে বারবার সংস্কারের জন্য নতুন করে খরচ করতে হয় না। এতে দেখা যায় বর্তমান রাস্তাগুলোর তুলনায় কংক্রিটের রাস্তায় খরচ অনেক কম হয়। যেমন একসময় চিটাগাংয়ে আরাকান রোড নামে একটি রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল যেটা চিটাগাং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত। ব্রিটিশরা ঐ রাস্তাটি করেছিল যা ৩০ বছরেও কিছু হয়নি।

আরসিসি হচ্ছে রড, সিমেন্ট, ইট বা পাথরের মাধ্যমে কংক্রিট তৈরি করে রাস্তার নির্মাণ।

এদিকে আমাদের দেশ বৃষ্টিপ্রবল হওয়ায় বিটুমিনের রাস্তা বৃষ্টির পানিতে সহজে ডেবে যায়। তাই বছর বছর রাস্তার সংস্কার করতে হয়। এতে খরচও অনেক বেশি হয়। তাই টেকসই রাস্তা নির্মাণের জন্য সরকার কংক্রিটের রাস্তা তৈরির পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কিছু কিছু বড় রাস্তা এই প্রকল্পের মাধ্যমে করা হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে দেশের সব বড় রাস্তা কংক্রিটের মাধ্যমে করার জন্য সরকার কাজ করছে। এতে সিমেন্টের বাজারও অনেক বড় হবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: সিমেন্ট বিক্রির দিকে দেশের বাজারে এমআই সিমেন্ট (ক্রাউন) পিছিয়ে আছে…

মাসুদ খান: এমআই সিমেন্ট দেশের বাজারে সিমেন্ট বিক্রির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও মানের দিক থেকে আমরা অন্য সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে। তাই সিমেন্ট রপ্তানির ক্ষেত্রে আমরাই বাংলাদেশে প্রথম অবস্থানে রয়েছি। তাছাড়া পদ্মা সেতু, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণে সবচেয়ে বড় পরিসরে আমরাই সিমেন্ট সরবরাহ করছি।

তাছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ বিশেষ করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাড়ি নির্মাণে কী পরিমাণ সিমেন্ট লাগবে অনেকে বোঝেন না। এতে ঝুঁকি থাকে। তাই এমআই সিমেন্ট রেডিমিক্স সিমেন্ট বাজারজাত করছে। এতে রেডিমিক্সে নির্মাণের সব উপকরণই যথাযথ মাত্রায় মেশানো রয়েছে। আর এমন ধারণা আমরাই প্রথম নিয়ে আসি। পাশাপাশি ভৌগলিক, আবহাওয়া মাটির গুণাগুণ বিষয়টি রেখে আমরা বিভিন্ন মানের সিমেন্ট বাজারজাত করছি। আমাদের বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে ক্রেতার এসব বিষয়ে ধারণা দেয়া হয়।

শেয়ারবাজারনিউজ: দেশে ও বিদেশের বাজারে আপনাদের সিমেন্ট বিক্রি বাড়ছে। এমন চাহিদার প্রেক্ষিতে কোম্পানির উৎপাদন ও বিপনন ব্যবস্থা কী অবস্থায় আছে?

মাসুদ খান: দেশে ও বিদেশের বাজারে আমাদের সিমেন্টের চাহিদা বাড়ছে। আর এমন চাহিদার প্রেক্ষিতে আমরাও সিমেন্ট উৎপাদন বাড়িয়েছি। বর্তমানে আমাদের দেশে বছরে ৬২ মিলিয়ন টন সিমেন্ট উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। প্রতিদিন এমআই সিমেন্টের কারখানায় ১১ হাজার টন সিমেন্ট উৎপাদন হচ্ছে। তাছাড়া সমুদ্র পথে সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য সরবরাহের জন্য আমাদের ৪টি মাদার ভেসেল ও ২১টি লাইটার ভেসেল রয়েছে। নদী পথে পণ্য সরবরাহের জন্য ১৮টি ট্রলার রয়েছে। সড়ক পথের জন্য ৩৫০টি ট্রাক ও ১১০টি বাল্ক ট্রাক সহ অন্যান্য মালবাহী যানবাহনের ব্যবস্থা রয়েছে। এতে আমরা নিজেরাই আমাদের পণ্য যথাযথ সময়ে সরবরাহ করতে সক্ষম।

শেয়ারবাজারনিউজ: কিন্তু বিক্রি বাড়লেও গতবছর এবং চলতি বছরে আপনাদের মুনাফা কমেছে। এর কারণ কী?

মাসুদ খান: এই সমস্যাটা শুধু আমাদের একার না। অন্য সিমেন্ট কোম্পানিগুলোরও একই অবস্থা। কিছু কিছু কোম্পানির তো উৎপাদনই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আর এমন সংকটের মূল কারণ হচ্ছে সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল ক্লিঙ্কারের সংকট। গত বছর বিশ্বব্যাপী ক্লিঙ্কারের তীব্র সংকট ছিল। তাই আমাদের বেশি দামে ক্লিঙ্কার আনতে হয়েছে। এতে সিমেন্টের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু সে হারে সিমেন্টের মূল্য বাড়েনি। পরিণতিতে মুনাফার মার্জিন কমে গেছে।

ক্লিঙ্কার সংকটের মূল কারণ চীন। কারণ শীতের সময় তিন থেকে চার মাস চীনে ক্লিঙ্কার উৎপাদন বন্ধ থাকে। পরিবেশগত দূষণের কারণে এই সময়টায় তারা উৎপাদন বন্ধ থাকে। আর এই সময়ে তারা ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করে চাহিদা মেটায়। আমরাও ভিয়েতনাম থেকে কাঁচামাল আমদানি করি। কিন্তু চীনের সঙ্গে সে দেশের কৌশলগত সম্পর্ক থাকায় তারা অগ্রাধীকার ভিত্তিতে পণ্য নিয়ে যায়। তাই সংকটের বাজারে আমাদের বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে হয়। তবে আমি আশাবাদী এই সংকট অচিরেই কেটে যাবে। তখন আবার বাজার স্বাভাবিক হবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: আপনাকে ধন্যবাদ।

মাসুদ খান: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য

*

*

Top