যে কারণে বীমায় ডিভিডেন্ড কমেছে

non-life insuranceশেয়ারবাজার রিপোর্ট: রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি বীমা বিষয়ে জনসচেতনতার উন্নতি না হওয়া এবং বীমা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আইডিআরএ’র সমন্বয়হীন সিদ্ধান্তের কারণে ২০১৪ হিসাব বছরে নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো ভাল ব্যবসা করতে পারেনি। আর এর প্রভাবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৬২ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) কমেছে। পরিণতিতে ৪১ শতাংশ কোম্পানি ডিভিডেন্ড কমাতে বাধ্য হয়েছে।

অথচ ২০১৩ অর্থবছরে নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো বেশ ভাল ব্যবসা করেছিল। সেই সময় কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ডও বেড়েছিল।

২০১৪ সমাপ্ত অর্থ বছরের জন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২৯টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি ডিভিডেন্ডের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে ১২টি কোম্পানির ডিভিডেন্ড কমেছে বিপরীতে মাত্র একটি কোম্পানির ডিভিডেন্ড বেড়েছে। অপরদিকে ১৬টি কোম্পানির ডিভিডেন্ডে পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ ২০১৩ অর্থ বছরে যে ডিভিডেন্ড দিয়েছিল ২০১৪ অর্থ বছরে শেয়ারহোল্ডারদের সেই একই ডিভিডেন্ড দিয়েছে।

এদিকে এই ২৯টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির মধ্যে ১৮টির মুনাফা এবং ইপিএস গত বছরের তুলনায় কমেছে। বিপরীতে ১১টি কোম্পানির মুনাফা ও ইপিএস বেড়েছে। এই ১১টি কোম্পানির মধ্যে মুনাফা ও ইপিএস বাড়া সত্ত্বেও ডিভিডেন্ড বাড়ায়নি ৯টি কোম্পানি। ১টি কোম্পানি নিটল ইন্স্যুরেন্স মুনাফা ও ইপিএস বাড়া সত্ত্বেও ডিভিডেন্ড কমিয়েছে। অপর কোম্পানি সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স মুনাফা ও ইপিএস বাড়ানোর পাশাপাশি ডিভিডেন্ডও বাড়িয়েছে।

জানা যায়, ইপিএস এবং ডিভিডেন্ড কমেছে এমন কোম্পানিগুলো হলো:

এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ১.৫০ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ১২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ১.৫৩ টাকা।

ঢাকা ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ৮ শতাংশ ক্যাশ ও ৭ শতাংশ স্টকসহ মোট ১৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ১.৮৪ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ২০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ২.২৪ টাকা।

ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ ক্যাশ ও ১০ শতাংশ স্টকসহ মোট ২০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ২.৯২ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ ক্যাশ ও ১০ শতাংশ স্টকসহ মোট ২৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ৪.০৮ টাকা।

ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ১.০৯ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ১১ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ১.২১ টাকা।

গ্রীণডেল্টা ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ ক্যাশ ও ১০ শতাংশ স্টকসহ মোট ২৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৩.৬১ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ ক্যাশ ও ১৫ শতাংশ স্টকসহ মোট ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ৩.৭২ টাকা।

কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ৭ শতাংশ ক্যাশ ও ৫ শতাংশ স্টকসহ মোট ১২ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ১.৫৩ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ৭.৫০ শতাংশ ক্যাশ ও ৫ শতাংশ স্টকসহ মোট ১২.৫০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ১.৭০ টাকা।

প্রগতি ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ১.৬৭ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ১২.৫০ শতাংশ ক্যাশ ও ৫ শতাংশ স্টকসহ মোট ১৭.৫০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ২.৭৫ টাকা।

রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ১.৭১ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ১২.৫০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ২.৭৬ টাকা।

রূপালী ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ ক্যাশ ও ৫ শতাংশ স্টকসহ মোট ১৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ১.৮৮ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ ক্যাশ ও ১০ শতাংশ স্টকসহ মোট ২০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ১.৯৪ টাকা।

স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১২ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ২.৬৬ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ৩.০৫ টাকা।

তাকাফুল ইন্স্যুরেন্স: ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১২ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ১.৪০ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ২.২৮ টাকা।

এদিকে নিটল ইন্স্যুরেন্স ইপিএস বাড়া সত্ত্বেও শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড কমিয়েছে। কোম্পানিটি ২০১৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে। আলোচিত অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৩.৬১ টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ৫ শতাংশ ক্যাশ ও ১২ শতাংশ স্টকসহ মোট ১৭ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ৩.৩৯ টাকা।

এদিকে ইপিএস কমলেও ডিভিডেন্ড অপরিবর্তীত রেখেছে ৮টি কোম্পানি। এগুলো হলো: বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স (বিজিআইসি), সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স, পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স, প্রাইম ইন্স্যুরেন্স, প্রভাতি ইন্স্যুরেন্স, রিলায়্যান্স ইন্স্যুরেন্স এবং সোনারবাংলা ইন্স্যুরেন্স।

বিজিআইসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী ব্যবসা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমকে বলেন, বর্তমানে নন-লাইফ বীমা ব্যবসা দেশের আমদানি-রপ্তানি নির্ভর। কিন্তু দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকায় আমাদানি-রপ্তানি ব্যাপক হারে কমেছে। যে কারণে আমাদের ব্যবসাও অনেক কমে গিয়েছে। তাছাড়া পূর্বে শেয়ারবাজারে বীমা কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করে ভাল মুনাফা করেছিল। কিন্তু শেয়ারবাজারের টানা মন্দাভাবের কারণে এখন সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। আর এসব কারণে কোম্পানিগুলোর মিুনাফা কমে যাচ্ছে। যার প্রভাব ডিভিডেন্ডের ওপর পড়েছে।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বীমা কোম্পানির মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমকে জানান, জনসচেতনতা না থাকায় এমনিতে বীমা ব্যবসায় সঙ্কট রয়েছে। এর মধ্যে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র সমন্বয়হীন নীতিমালা প্রণোয়ন এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা না করে অনিয়মের দায়ে ঢালাওভাবে কোম্পানিগুলোকে জরিমানা করছে। আবার তা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশ হচ্ছে। এতে বীমার প্রতি জনসাধারণের বিরুপ মনোভাব বেড়েছে। এতে বীমা ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

২০১৪ অর্থবছরে নন-লাইফ বীমা ব্যবসা কমার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির হোসেন শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার নিরসন না হওয়ায় দেশের ব্যবসা বাণিজ্য কমেছে। বিশেষ করে পোষাক খাতে ব্যবসা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের আমদানি-রপ্তানিতে ধস নামায় এর প্রভাব বীমা ব্যবসার ওপর পড়েছে।

তিনি আরো বলেন, বীমা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে কোন সংস্থাই ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আর এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকেও তেমন সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ বীমা ব্যবসার প্রসার বাড়াতে হলে এর বিকল্প নেই। যতদিন সরকারি বেসরকারি সম্পদের নিরাপত্তা বীমা বাধ্যতামূলক না হবে ততদিন বীমা ব্যবসার প্রসার হবে না।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/তু/সা/ও

 

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top