আজ: রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ইং, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৮ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

১২ মে ২০১৫, মঙ্গলবার |


kidarkar

স্প্রেড নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ কেন্দ্রিয় ব্যাংক!


bangladeshbankশেয়ারবাজার রিপোর্ট: স্প্রেডসীমা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিলেও এ সীমা মানছে না দেশের বেশিরভাগ শীর্ষস্থানীয় বানিজ্যিক ব্যাংক। আর এক্ষেত্রে বিদেশী ব্যাংকগুলো আরও দুই ধাপ এগিয়ে। নির্ধারিত সীমার ধারে কাছেও নেই তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদহার ব্যবধান ( স্প্রেড) পাঁচ শতাংশে নিচে হলেও সেই সীমা মানছে না অন্তত দুই ডজন ব্যাংক। এর মধ্যে অর্ধডজন ব্যাংকের এই সীমা রয়েছে দ্বিগুণেরও কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিচালনা ব্যয় এবং খেলাপী ঋণের কারণেই স্প্রেডের হার কমাতে পারছে না ব্যাংকগুলো। আর অর্থনীতিবিদরা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য, এক্ষেত্রে ব্যবসায়িদেরকেই উদ্যোগী হতে হবে। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যংকের কিছুই করার নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের মার্চ শেষে ব্যাংকখাতে আমানত ও ঋণের সুদের গড় ব্যবধান (স্প্রেড) ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে। মার্চে ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৪.৮৭ শতাংশ পয়েন্ট। যা আগের মাসে (ফেব্রুয়ারিতে) ছিল ৫.৪০ শতাংশ পয়েন্ট। প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ৫৬টি ব্যাংকের ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ১১.৯৩ শতাংশ পয়েন্টে যা আগের মাসে ছিল ১২.২৩ শতাংশ। আমানতের গড় সুদহারও কিছুটা কমে ৭.০৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে যা আগের মাসে ছিল ৭.১৯ শতাংশে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পৃথক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, স্প্রেডের এই সীমায় নেই অন্তত ২ ডজন দেশী-বিদেশী ব্যাংক। এর মধ্যে ১১টি ব্যাংকের স্প্রেড ছয় থেকে ১০ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে। আর বিদেশি খাতের একটি ব্যাংকের সুদ স্প্রেড ডাবল ডিজিট অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা না মানার তালিকায় রয়েছে বিশেষায়িত খাতের একটি, বিদেশি ছয়টি ও বেসরকারি খাতের ১৬টি ব্যাংক। তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানার চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের গড় স্প্রেড হার দাঁড়িয়েছে ৩.৬৪ শতাংশ।
বারবার তাগাদা দিয়ে গড় হার ৫ এর নিচে আসলেও সব ব্যাংকের মাঝের এই ব্যবধান কমাতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদিকে মুক্ত বাজার অর্থনীতির অজুহাতে ইচ্ছামতো সুদ নিচ্ছে ব্যাংকগুলো।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের চলমান ব্যাংক ব্যবস্থার কারণেই এটা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণের অভাবে বাড়ছে খেলাপী ঋণ। তার কারণে তারা কম সুদে ঋণ দিতে পারছে না। পরিচালনা ব্যায় বাড়ার কারণে আমানতে বেশি সুদও দিতে পারছে না। সব মিলিয়ে স্প্রেড কমানো আর সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কম স্প্রেড হারের কারণেই গড় হার কমেছে।
তাদের মতে, দেশের চলমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এক ধরনের সিন্ডিকেট কাজ করছে। যার ফলে কোন প্রতিযোগীতা নেই। প্রতিযোগিতাহীন বাজাওে ব্যাংকগুলো নিজেদের মতো করে ঋণ ও আমানতে সুদহার বসাচ্ছে। এক্ষেত্রে পরিচালনা ব্যয়ের সাথে খেলাপী ঋণকেও দায়ী করেন অনেকে। সরাসরি না হলেও স্প্রেডসীমা কমানোর ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার কৌশল নিতে পারতো বাংলাদেশ ব্যাংক।
মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে এ বিষয়ে সরাসরি বাংলাদেশের ব্যাংকের কিছুই করার নেই মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান। এ বিষয়ে তিনি শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমকে বলেন, ‘ মুক্তবাজার অর্থনীতিতে স্প্রেড সীমা বেধে দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। তবে কেন্দ্রিয় ব্যাংক এ সীমা নিয়ন্ত্রন করতে পারে। এ লক্ষ্যে আমরা ব্যাংকগুলোকে প্রনোদনামুলক উৎসাহ দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য আমরা পূরণ করেছি। এবং তা নিয়মের মধ্যে থেকেই। তিনি বলেন, গ্রাহকরা যদি কম সুদে যে ব্যাংক ঋণ দেয় তাদের কাছ থেকে ঋণ আর আমানতে যারা বেশি মুনাফা দেয় তাদের কাছে আমানত রাখে তবেই এই পার্থক্য দূর হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে গ্রাহকরা বুঝে শুনে ভাল ব্যাংকগুলোর সঙ্গে লেনদেন করবে। ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর ব্যবসায়ি ও বড় ক্লায়েন্টরা যদি উদ্যোগী হয় তবেই এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব।’
পরিবেশ ভাল রাখা ও ভাল বিনিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব সময় কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন আমরা আগামী গড় স্প্রেড ৪ এ নামিয়ে আনার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী পাঁচ শতাংশ পয়েন্টের মধ্যে স্প্রেড সীমাবদ্ধ রাখতে বলা হলেও ৯টি বিদেশি ব্যাংকের ছয়টিই তা পরিপালনে ব্যর্থ হয়েছে। বরং কোনো কোনো ব্যাংকের এ ব্যবধান ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিদেশি ৯টি ব্যাংকের গড় স্প্রেড ৮.৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিদেশী ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশি স্প্রেড রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। ব্যাংকটি স্প্রেড ১০.৫১ শতাংশ। এছাড়া এই তালিকায় রয়েছে ওরি ব্যাংক (৯.৭৮) সিটি ব্যাংক এনএ (৯.৬৪), এইচএসবিসি (৭.১৬), কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন (৭.৬৮) হাবিব ব্যাংক লিমিটেড (৫.৯৯)।
স্প্রেড সীমার ক্ষেত্রে দেশের ৩৮ বেসরকারিবাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যের ১৬টিই নির্দেশনা পরিপালন করছে না। এই ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানতের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৫.৩১ শতাংশ।
দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্প্রেড ব্র্যাক ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্প্রেড ৯.৮৬ শতাংশ পয়েন্টে। এই তালিকায় পর্যায় ক্রমে রয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক (৮.৮০),প্রাইম ব্যাংক (৬.৫৬) যমুনা ব্যাংক (৫.৯১) প্রিমিয়ার ব্যাংক (৬.৯০), ব্যাংক এশিয়া (৫.৪৮) বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক (৫.৮৯) ওয়ান ব্যাংক (৫.২৫), ঢাকা ব্যাংক (৫.২০), সাউথ-ইস্ট ব্যাংক (৪.৯৯), আইএফআইসি ব্যাংক (৬.৪০) এবি ব্যাংক (৫.৫০) এবং উত্তরা ব্যাংক (৫.৯৫)।
জানা যায়, দেশে স্প্রেডের এই হার দক্ষিণ এশিয়ার অন্য যেকোন দেশের তুলনায় অস্বাভাবিক। মালয়েশিয়ায় যেখানে আড়াই শতাংশ চীনে ৩.১, এবং ভিয়েতনামে ২.৪০ শতাংশ।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ও/তু/সা


আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.