কমিশন ও পুঁজিবাজার: অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি

নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২৫ বছর পূর্ণ করেছে এ বছরের জুন মাসে। অপেক্ষাকৃত নতুন হলেও এ সংস্থাটির অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে, যা উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে সংগ্রহ করে জনগণের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে নিশ্চিত করে সম্পদের কাম্য বন্টনের প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাজারের ভূমিকাকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখি। এ কারণেই বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সকল অংশীজন, নীতি-নির্ধারক ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতাকে সমন্বয় করা ও অংশীজনদের স্বার্থ রক্ষা করার গুরু দায়িত্বটি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিপুণভাবে পালন করতে হয়।

যেহেতু পুঁজিবাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল,সেহেতু এখানে ঝুঁকি ও লাভ-ক্ষতির বিষয়টি জড়িত, যেহেতু ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের সচেতনতার মাত্রা এখনেও কাঙ্খিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি এবং যেহেতু স্বার্থন্বেষী মহল কারসাজির মাধ্যমে বাজারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, সেহেতু নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সামর্থ এবং যথাযথ আইন-কানুনের উপস্থিতি ও প্রয়োগের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

দীর্ঘ সাত বছরেরও অধিক সময় ধরে এরকম মহৎ এক কর্মযজ্ঞে নিবেদিত হয়ে পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির বিষয়টি সামনে চলে আসে। দেশের জন্য অন্তর্নিহিত ভালোবাসা থাকে দেশপ্রেমে উদ্বৃদ্ধ প্রতিটি নাগরিকের। কিন্তু বৃহৎ জনগোষ্ঠির জন্য নিষ্ঠার সাথে কাজ করে দেশ সেবা করে দেশপ্রেমকে শাণিত করার সুযোগ সকলের হয়না। এমনই একটি বিরল সুযোগ আমার জীবনে এসেছে।

২০১০-২০১১ সালের ভয়াবহ উত্থান-পতনের পর যখন পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল, যখন সর্বস্ব হারিয়ে অনেকের জীবনে নেমে এসেছিল অমানিশার ঘোর অন্ধকার, পুঁজিবাজারকে ঘিরে যখন সামাজিক বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল, সর্বোপরি আর্থিক খাতের অন্যতম অংশ পুঁজিবাজারের অস্থিরতায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিকাশের পথ অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, ঠিক সে সময়ে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আমাকে দায়িত্ব নিতে বলেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব দেয়ার। এরপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আইন অনুযায়ী নির্বিঘ্নে কাজ করে যেতে বলে সমস্ত সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। দায়িত্ব নিয়ে আমার ক্ষুদ্র সামর্থে পুঁজিবাজারকে সকলের সহযোগিতায় এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আমি নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যমান মনে করি। কেননা আমার সামনে দায়িত্ব নেয়ার শুরুতে ছিলো অগণিত সমস্যা। ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে তখন পুঁজিবাজার। প্রতিটি ধ্বংসযজ্ঞ নতুন করে গড়ার ভিত্তি রচনা করে যায় বলেই আমার সামনে এসে গেল তার সমাধানের সুযোগ। দার্শনিকরা বলে থাকেন, প্রতিটি বিজ্ঞানীর সামনে সমস্যা চিহ্নিত হওয়া তার জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত বিজ্ঞানীরা সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন বলেই তার সমাধান করে হয়েছেন বিশ্বনন্দিত, করতে পেরেছেন সমাজ-জীবনে কল্যাণকর পরিবর্তন। অবশ্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সমস্যা চিহ্নিত করে যত সময়ই লাগুক তার সমাধান করা যায়। কিন্তু পুঁজিবাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল, আর্থ-সামাজিক, আচারণগত উপাদান, বিভিন্ন খাতের সাথে আন্ত:সম্পর্ক, রাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতির সাথে অনেক ক্ষেত্রে জড়িত বলে এককালীন কোন সমাধান সম্ভব নয়। যথাযথ আইন-কানুন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, যথাযথ পরিপালন, তদারকি, পরিদর্শন, সংশ্লিষ্টদের চেতনায় পরিবর্তন এনে একটি স্থিতিশীল অবস্থার তৈরী করা যায়, কিন্তু চিরদিনের জন্য সকল সমস্যা সমাধান কোন দেশেই কোন কালেই সম্ভবপর হয়নি, এখনও হচ্ছেনা। প্রতিটি বিষয়ের গতিময়তা, অনিশ্চয়তা ও জটিলতা অত্যন্ত বেশি এবং এগুলো আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে এতটাই সম্পর্কিত যে নিরঙ্কুশ পরিপূর্ণতার বিষয়টি অধরা থেকে যায়।

ক্রমবর্ধনশীল অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপট বেসরকারী খাত বিশেষ করে কর্পোরেট উপখাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, বাড়ছে বৈদেশিক বিনিয়োগ। এ ক্ষেত্রে সকল ধরনের সহযোগিতা প্রদান করে শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়নের অত্যতম পূর্বশর্ত। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও এর গুরু দায়িত্ব বর্তায় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার উপর। পুঁজিবাজার বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনদের সমন্বয়ে পরিচালিত হয় বলে এখানে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ জনবল। আইন ও বিধি-বিধান পরিপালনের বিষয়টি যথাযথভাবে তত্ত্বাবধান ও তদারকির দায়িত্বে কমিশনে রয়েছে প্রাথমিক ভাবে ৪টি বিভাগ (সার্ভেল্যান্স, সুপারভিশন এন্ড রেগুলেশন অব ইন্টারমিডিয়ারিজ, সুপারভিশন অ্যান্ড রেগুলেশন অব মার্কেট অ্যান্ড ইস্যুয়ার কোম্পানীজ ও কর্পোরেট ফিন্যান্স)। ভারতসহ উন্নত দেশগুলোতে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় এ সকল প্রতিটি বিভাগে যেখানে শত শত দক্ষ জনবল নিয়োজিত রয়েছে, সেখানে বিএসইসিতে মাত্র কয়েকজন এ বিশাল দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। কাজেই অনেক কিছুই নজরের বাইরে থাকার সুযোগটি এখানেই থেকে যায়। যথাসময়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেও এটি একটি বিরাট অন্তরায়।

অর্থনীতির এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ পুঁজিবাজার, যেখানে এক হাজারেরও বেশী বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সেখানে মাত্র দু’শয়ের কম জনবল নিয়ে সাধ্যমত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে আমরা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছি। আমি কমিশনের নিবেদিত প্রাণ কর্মচারীদের কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত। দেশেপ্রেমের চেতনায় উদ্ভাসিত না হলে সংখ্যায় স্বল্প হলেও অর্পিত দায়িত্ব পালনে তারা নিরলসভাবে এত পরিশ্রম করতে পারতেন না। রাতারাতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য দক্ষ জনবল তৈরী করা সম্ভব নয়। দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতার সাথে উন্নত প্রশিক্ষণই হতে পারে এ সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায়। আমরা বিদ্যমান লোকবলকে এবং নতুন জনবল নিয়োগ করে তাদেরকে সেভাবেই প্রশিক্ষিত করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষাই আমার প্রধান দায়িত্ব। তাদের সুরক্ষার বিষয়টি আমাকে সারাক্ষণ গভীরভাবেই ভাবায়। আমি মনে করি, বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের চেতনায় পরিবর্তন নিয়ে আসাটাই হবে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার মূল চাবিকাঠি। এ উদ্দেশ্য পূরণকল্পে দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম, যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি উদ্বোধন করেছেন তা সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষিত হয়েছিল তার বাস্তবায়ন আজও অব্যাহত রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা তহবিল নামে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা নতুন কেন্দ্রীয় ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানি হলে আরো ভালোভাবে কার্যকরী ও বিনিয়োগকারীবান্ধব হবে। সুরক্ষার আরেকটি অন্যতম উপাদান হলো বিনিয়োগের জন্য বিকল্প ইনস্ট্রুমেন্ট/পণ্যের উপস্থিতি। আমরা সেদিকেও গভীরভাবে মনোযোগ দিচ্ছি। কিন্তু শেষ বিচারে যেহেতু পুঁজি বিনিয়োগকারীর, ঝুঁকিও বিনিয়োগকারীর। তাই সঠিক সময়ে বিনিয়োগ বা বিনিয়োগ থেকে বের হয়ে আসার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের উপরই প্রত্যেকের সাফল্য নির্ভর করে।

আমাদের আজকের পর্যায়ে উন্নীত হবার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ২৫ বছরের অমসৃণ পথ চলার অভিজ্ঞতা। বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মচারী এবং কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার/সদস্যদের অবদান। বিনিয়োগকারী, স্টক এক্সচেঞ্জ, আইসিবিসহ সকল অংশীজনদের ভূমিকাকেও আমরা শ্রদ্ধাভরে স্বীকার করছি। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরা গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমাদের গৃহীত কর্মকাণ্ডের মূলমন্ত্র সকলের কাছে পৌছে দিয়ে চেতনাকে শাণিত করার যে মহান দায়িত্বটি পালন করেছেন ও করে যাচ্ছেন সে জন্য তাদের প্রতি প্রকাশ করছি অপরিসীম কৃতজ্ঞতা।

একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের উপস্থিতি এবং সুষ্ঠু বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য আমরা নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বান্ধব পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রচেষ্টায় অনেকটাই সফলকাম হয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে যুগিয়েছেন অনুপ্রেরণা, দিয়েছেন প্রত্যক্ষ সহযোগিতা। ”একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার একটি উন্নত অর্থনীতির অন্যতম পূর্বশর্ত”-মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ দর্শনের আলোকে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধান ও অর্থমন্ত্রনালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সর্বাত্মক সহযোগিতা পুঁজিবাজারের ধারাবাহিকতা উন্নয়নে এবং কমিশনকে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থায় রূপান্তরে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে।

আমার বিশ্বাস, সকলের আন্তরিক সহযোগিতায় পুঁজিবাজার আগত দিনে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তথা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে কাঙ্খিত অবদান রাখতে সমর্থ হবে।

 

লেখক:

ড. এম. খায়রুল হোসেন

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top