শেষ বয়সে পিতা-মাতার আশ্রয়স্থল কেন বৃদ্ধাশ্রমে?

পৃথিবীতে মা-বাবা এমন এক আশ্রয় সংস্থা যার তুলনা পৃথিবীর কোনো বাটখারায় পরিমাপ করা যায় না। যায় না সেই পরম স্নেহের ওজন দেয়া কোনো ওয়েট মেশিনে। সুতরাং এই মা এবং বাবা শেষ বয়সে কেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকবে প্রশ্নটি সচেতন প্রতিটি সন্তানের বিবেকের কাছে রইল। মা-বাবা না থাকলে আমরা পৃথিবীর আলোই দেখতে পেতাম না। যে মা পরম স্নেহে শত অবর্ণনীয় কষ্ট, আঘাত, যন্ত্রণা সহ্য করে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করলো আবার জন্মের পর থেকে লালন-পালন করা, পড়ালেখা শেখানো, সন্তানদের হাসিখুশি রাখতে কত ত্যাগ স্বীকার করলো সেই বাবা-মায়েদেরই বৃদ্ধ বয়সে থাকতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। মানবতার প্রতি এ এক চরম উপহাস। দু’দশক আগেও দেশে বৃদ্ধাশ্রম তেমন একটা ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিন্তু কেন এই বৃদ্ধাশ্রমে? এই প্রশ্নের উত্তর বড়ই করুণ। ছোটবেলায় যে বাবা-মা ছিল সব সময় নিরাপদ আশ্রয়স্থল, আজ সেই বাবা-মাকেই ঝামেলা মনে হচ্ছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার, তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর বা দেখভাল করার এতটুকু সময় আজ আমাদের নেই। শুধু তাই নয় অনেকেই আবার পিতা-মাতার ওপরে হাত উঠানোর মত ঘৃণ্য, নিন্দনীয় ও ইসলামবহির্ভূত কাজও করে থাকেন। অনেক পরিবারের বউ হয়ত শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজের বাবা-মায়ের মতো করে মন থেকে মেনে নিতে পারে না। আবার অনেকেই এমন স্ত্রীর পিতা-মাতার ওপরে আনীত বিভিন্ন অভিযোগে তাদের বিরোধী হয়ে যায়। ফলে তাদের স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। এটা কোনো সমাধান নয়। দেখা যায়, এক সময় যারা নামিদামি বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, চাকরিজীবী ছিলেন তাদের অনেকেই আজ নিজ সন্তানদের অবহেলা, অযত্ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা হতে বাধ্য হচ্ছেন। সবকিছু থাকতেও সন্তানহারা এতিম হয়ে জীবন যাপন করছেন। এমন দুঃখী পিতা-মাতাদের বুকভরা কষ্ট থেকে সন্তানকে লেখা চিঠি প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়। যা পড়ে চোখের পানি সংবরণ করা যায় না। আমরা যারা তাদেরকে অবহেলা ও বোঝা মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছি, তারা কি একবার ভেবেছি আমাদেরকেও একদিন বৃদ্ধ হতে হবে। খুব বেশি দূরে নয় আমাদেরকেও নিজ সন্তানের অনুরূপ আচরণের শিকার হয়ে শেষ বয়সে এই বৃদ্ধাশ্রমেই বাকি জীবন কাটাতে হতে পারে। সত্যিই বিবেকের কাছে আজ আমরা পরাজিত আর বড়ই অকৃতজ্ঞ। আজ আমরা চাকরি করে, ব্যবসা করে বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছি, সুনাম কুড়াচ্ছি। তারপর বিয়ে করে নতুন সংসার নিয়ে আলাদাভাবে থাকছি। অন্যদিকে বৃদ্ধ পিতা-মাতা কি খাচ্ছে, কি পরছে, কোন কোন জটিল ও কঠিন রোগে ভোগছে সেদিকে বিন্দুমাত্র কোনো খেয়াল নেই। সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার একটি গল্প বলছি- কোনো এক অসহায় মা তার সন্তানকে নিয়ে শহরে থাকতেন। ছেলের বুঝ জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছে একটা চোখ না থাকাতে মাকে কুৎসিত দেখায়। মা একদিন স্কুলের পাশ দিয়ে কোথাও যাওয়ার সময় ছেলেকে দেখতে গেলেন। এই কুৎসিত দেখানোর কারণে সহপাঠীরা হাসাহাসি করবে এই লজ্জার ভয়ে ছেলে সেদিন দেখা করেনি। মা কিছু না বলে ফিরে এলেন। ছেলে এক সময় বড় হয়ে চাকরি পেলো। বিয়ে করে মায়ের আর কোন খোঁজ-খবর না রেখে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। কয়েক বছর পর ছেলে তার স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের পুনর্মিলনী দাওয়াত পেয়ে আসলো। এই ফাঁকে মাকে দেখতে গেলে জানতে পারে যে ভাড়া বাসায় মা থাকতেন সেখানে এখন অন্য কেউ থাকে। পাশের বাড়ির মায়ের বয়সী এক মহিলা তাকে একটা চিঠি দিয়ে বললেন, তোমার মা মারা যাওয়ার আগে তোমাকে এটা দিতে বলে গেছেন। চিঠিতে লেখা ছিল- “বাবা! আমি জানি আমার একটা চোখ না থাকাতে কুৎসিত দেখানোর কারণে অন্যদের মতো তুমিও আমাকে পছন্দ করতে না। আমার চোখ না থাকার কারণটা জানতে পারলে তুমি নিশ্চয় আমাকে আর ঘৃণা করতে না। তুমি ছোট থাকা অবস্থায় তোমার আব্বু, আমি আর তুমি সহ একদিন এক গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হই। সেদিন তোমার আব্বু মারা যান, আমি গুরুতর আহত হই আর তোমার একটি চোখ চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। অপারেশন করিয়ে আমি আমার একটি চোখ তোমাকে দিয়ে দিই। এই ঘটনা আর কেউ জানে না এবং আমি কাউকে বলিনি। মায়ের ভালোবাসার ইতিহাসে এমন হাজারও নজির রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের সামাজিক আর সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় ওল্ড হোমগুলো অপরিহার্য হলেও আমাদের মাটির আঙিনায় তা শুধু বেমানানই নয় এর নৈতিকতার দিকটিও বিবেচনা করা দরকার। বৃদ্ধাশ্রমে যেন কখনোই না হয় দায়িত্ব এড়ানোর হাতিয়ার। দিনের পর দিন একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে। দেখা যায়, বাবা-মায়ের সেবা-যত্ন বা ভরণ-পোষণকে কেন্দ্র করে শুরু হচ্ছে দাম্পত্য কলহ আর এর পরিণতিতে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত মানুষগুলোকে দেখে মনে হয় তারা আনন্দেই আছেন। কিন্তু তাদের মনের বেদনাগুলো ঠিকই প্রকাশ পায়। তারা নিজের পরিবারের সান্নিধ্য কামনা করেন, ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে থাকতে চান। শত মান-অভিমান থাকা সত্ত্বেও অপমান, অযত্ন, অবহেলা করা নাড়িছেঁড়া সন্তানটিকে যে মা কখনোই ভুলতে পারেন না। কিন্তু সেই নিষ্ঠুর সন্তানটি কি মাকে একবার মনে করে! ঈদ কিংবা অন্যান্য বিশেষ দিনেও যখন পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের খোঁজ নেয়া হয় না তখন এমন আনন্দের দিনেও নীরব চোখের জলেই তারা সান্ত্বনা খোঁজেন। তবে যারা তাদের নিজ অর্থায়নে, নিজ উদ্যোগে এই সব অসহায় বৃদ্ধ মানুষগুলোর জন্য বৃদ্ধাশ্রম খুলে তাদের ভরণ-পোষণ, চিত্ত বিনোদন এমনকি চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে নিজের বাবা-মায়ের মতই সেবা-যত্ন দিয়ে লালন-পালন করার ব্যবস্থা করেছেন তারা সবার কাছে প্রশংসার দাবিদার। আমাদের দেশে এ পদ্ধতিটি স্বীকৃত কোনো পদ্ধতি বা স্বাভাবিক কোনো বিষয় হয়ে উঠার আগেই এ নিয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পাল্টাতে হবে মানসিক পরিবর্তন তবেই সুখী ও সমৃদ্ধ পরিবার তৈরি করতে পারবো। পারবো শ্রদ্ধা-সম্মানের সুষম বণ্টন করতে। মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক অনুশাসন, ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসার, নৈতিক মূল্যবোধ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। শেষ বয়সে প্রতিটি বৃদ্ধ মানুষের ঠাঁই যেন হয় পরিবারে এবং আরাম-আয়েশে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে সরকারকেও আইনের মাধ্যমে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাতে করে একটা সময় আর কাউকে বৃদ্ধাশ্রমে শেষ বয়সে যেতে হবে না।
ই-মেইল:

[email protected]

আল-আমিন আহমেদ জীবন
সাবেক ছাএ- সিলেট এম সি,কলেজ

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top