আজ: মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১ইং, ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

৩০ ডিসেম্বর ২০২০, বুধবার |


kidarkar

করোনায়ও গতিময় বছর পার শেয়ারবাজারের: উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতায় নানা উদ্যোগ, সংস্কার ও সিদ্ধান্ত কমিশনের

আতাউর রহমান: ২০১৯ সালকে মন্দা ও দরপতনের মাধ্যমে বিদায় জানালেও কিছুটা আশা নিয়ে ২০২০ সাল শুরু করেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। তবে তাদের সে আশা আর আলোর মুখ দেখতে পারেনি বছরের প্রথম ছয় মাসে। টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারাতে থাকে শেয়ারবাজার। সেই সাথে আস্তে আস্তে মুখ ফিরিয়ে নেয় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। বাড়তে থাকে তারল্য সংকট।

চলতি বছরের মার্চ মাসে সারা বিশ্বে দেখা দেয় কোভিড-১৯ মহামারি। লকডাউনে চলে যায় সারা দেশ। সেই সাথে ৬৬ দিন বন্ধ থাকে দেশের উভয় শেয়ারবাজার। স্বল্প পরিসরে সবকিছু চালু হলে করোনা পরিস্থিতির মাঝেই দায়িত্ব গ্রহণ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম ও তার নেতৃত্বে ৩ জন কমিশনারগণ। পরবর্তীতে বিএসইসির অনুমতিক্রমে চালু করা হয় শেয়ারবাজার।

এর আগে টানা দরপতনের কারণে শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দেয় তৎকালীন কমিশন। যাতে কোনো শেয়ারে একটি দরের পর আর পতন না হয়। এতে বড় পতনের হাত থেকে রক্ষা পায় শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগকারী। এরপরে শেয়ারবাজার চালু হলেও লেনদেনের সময় কমিয়ে দেয়া হয়। পরে ধীরে ধীরে সময় বাড়লেও লেনদেন থাকে তলানিতে।

করোনাকালে নতুন কমিশন দায়িত্ব নিয়ে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। ফলে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২০ সালের শুরুতে বাজারে লেনদেন তলানিতে নেমে যায়। জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হয়েছে ২৯৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আর বছরের শেষ কার্যদিবসে (৩০ ডিসেম্বর) ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৫৪৩ কোটি ২৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা।আলোচ্য সময়ের ব্যবধানে বাজারে লেনদেন বেড়েছে ১ হাজার ২৪৬ কোটি ৯৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা। এছাড়া গত ছয় মাসে বেশ কয়েকবার লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল।

একই অবস্থা সূচকেও। গত ৩০ ডিসেম্বর ডিএসই প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪০২ পয়েন্টে। যা ২০২০ সালের প্রথম দিন ছিল ৪ হাজার ৪৫৩ পয়েন্টে। আলোচ্য সময়ের ব্যবধানে সূচক বেড়েছে ৯৪৯ পয়েন্ট।

সূচক ও লেনদেন গতিশীল হওয়ার কারণে বাড়তে থাকে বাজার মূলধন। বছরের শুরুতে ডিএসইতে বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার ৪৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।  গত ৩০ ডিসেম্বর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ২৩০ কোটি ৫ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ের ব্যবধানে বাজার মূলধন বেড়েছে ১ লাখ ০৮ হাজার কোটি টাকা।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর বাজারে লেনদেন চালু হলেও অব্যাহত থাকে লেনদেন খরা। তবে জুলাই মাসে এসে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠিন বার্তা দেয় নতুন কমিশন। অনিয়মে জড়িত থাকায় একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়।

সতর্ক করা হয় সরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি)। বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসকে জরিমানার পাশাপাশি সতর্ক করা হয়। পরে আইসিবিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। বাতিল করা হয় বেশ কিছু দুর্বল কোম্পানির আইপিও। সম্পূর্ণ শেয়ারবাজারকে আইটি প্লাটফর্মে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আইসিবি পুনর্গঠনের জন্য একজন কনসালটেন্ট এবং আইটি প্লাটফর্ম তৈরিতে একজন কনসালটেন্ট নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার একের পর এক পদক্ষেপের ফলে ঘুরে দাঁড়ায় বাজার। ১০০ কোটি টাকার নিচে নেমে যাওয়া লেনদেন এখন হাজার কোটি টাকার বেশি হয়।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বে বর্তমান কমিশন বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে এসেছে। এরই সুফল বাজারে দেখা যাচ্ছে। আগামীতে বিনিয়োগকারীদের এ আস্থা ধরে রাখাই বাজারের জন্য সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ।

তারা আরো বলেন, কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে করোনাকালে বাজার পরিস্থিতিকে গতিশীল করতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে, বাজারকে আকর্ষণীয় করতে নানান ধরনের উদ্যোগ হাতে নেয়। একই সঙ্গে বাজারের দুষ্ট চক্র ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেন। এর মাধ্যমে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করে। বাজারে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। যার ফলে বাজারের সূচক ও লেনদেন তলানি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে থাকে। বাজারে বাড়তে থাকে মূলধন। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাজার আরও গতিশীল হবে।

এদিকে বছর জুড়ে শেয়ারবাজারের উন্নয়নে ও স্থিতিশীলতায় একের পর এক উদ্যোগ, সংস্কার ও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কমিশন। দীর্ঘদিন ধরে পরে থাকা ২% ও ৩০% শেয়ার ধারণের বিষয়টি বাস্তবায়ন ও ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর বোর্ড পুনর্গঠন। ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিকে পূনর্গঠনের জন্য কোম্পানির বোর্ডকে আর্থিক প্রতিবেদন ও কর্মপরিকল্পনাসহ কমিশনে তলব। কোম্পানির শেয়ার লেনদেন, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রি ও তালিকাভুক্ত হিসেবে কোম্পানির কার্যক্রম নিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করে কমিশন।

এছাড়া ওটিসি মার্কেটের কোম্পানি নিয়ে নতুন পরিকল্পনা, আইপিও প্রসেসে সময় কমিয়ে নিয়ে আসা ও আবেদনকারী সবাইকে আইপিও শেয়ার বরাদ্দ দেয়ার উদ্যোগ, লেনদেন বাড়াতে বন্ড অনুমোদন ও শেয়ারবাজারে লেনদেনের নির্দেশ এবং মিউচুয়াল ফান্ডের উন্নতিতে কার্যক্রম হাতে নেয় কমিশন।

এর বাইরেও কমিশন সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে বৈঠক করেছে এবং তাদেরকে এক প্লাটফর্মে নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যাতে করে কোম্পানির জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। শেয়ারবাজারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকার বিশেষ ফান্ডের তদারকি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা ও নতুন ফান্ডের বিষয়ে কাজ করছে কমিশন। এবং সেই সাথে দীর্ঘদিন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে অলসভাবে পরে থাকা সরকারের ট্রেজারি বন্ডের লেনদেনের বিষয়েও কাজ করে যাচ্ছে বিএসইসি।

বছর শেষে অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাজার মূলধন গত ৩০ ডিসেম্বর ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৪৯৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। আর গত ২ জুলাই সিএসইর বাজার মূলধন ছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ের ব্যবধানে বাজার মূলধন বেড়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

সিএসই সার্বিক সূচক সিএএসপিআই গত ৩০ ডিসেম্বর ছিল ১৫৫৯২.৯২ পয়েন্ট। আর গত ২ জুলাই ছিল ১১৩২১.১২ পয়েন্ট। আলোচ্য সময়ের ব্যবধানে সূচক বেড়েছে ৪২৭১.৮ পয়েন্ট।

এদিকে সিএসইর গত ৩০ ডিসেম্বর লেনদেন হয়েছে ৭১ কোটি ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৮০ টাকা। আর গত ২ জুলাই ছিল ২ কোটি ৩২ লাখ ৬২ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ৬৮ কোটি ৭৯ লাখ ২৩ হাজার ৬১১ টাকা।

গত কয়েক বছরের মন্দা, পতন ও হতাশা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে শেয়ারবাজার। আস্থা ফিরতে শুরু করেছে বাজার সংশ্লিষ্ট সকলের ও বিনিয়োগকারীদের মাঝে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম ও কমিশনগনের সততা, উদ্যোগ ও পরিকল্পনাকেই ধন্যবাদ জানাচ্ছে সকলে।

সবাই আশা করছে আগামী দিনগুলোতে আরো ভালো অবস্থায় যাবে শেয়ারবাজার। বিশ্বের উন্নত দেশের শেয়ারবাজার গুলোর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারও এগিয়ে যাবে। এবং দেশের জিডিপি তে একটি বড় অংশ অবদান রাখবে বলে আশা করছে বাজার সংশ্লিষ্ট সকলে।

 

শেয়ারবাজার নিউজ/এন

 

 

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.