আজ: বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২ইং, ২২শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৫ই জিলহজ, ১৪৪৩ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

০২ ফেব্রুয়ারী ২০২২, বুধবার |



kidarkar

প্রণোদনার ঋণে আইএফআইসি ব্যাংকের অনিয়ম!

এ জেড ভূঁইয়া আনাস: বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক আইএফআইসি ব্যাংকের তিনটি শাখায় প্রণোদনার তহবিল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে ব্যাংকটির মতিঝিলের ফেডারেশন শাখা, গুলশান ও নারায়ণগঞ্জ শাখায় এই অনিয়ম ধরা পড়ে। ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের প্রণোদনার ভর্তুকি বাতিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার ২০২০ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে, ৩০ হাজার কোটি টাকা বড় শিল্প এবং পরিষেবা খাতের জন্য ঘোষণা করা হয়। ৯ শতাংশ সুদ হারে বিতরণ করা এই ঋণে ৪.৫ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার।

একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রেডিট গ্যারান্টি স্ক্রিম ঘোষণা করে এর আওতায় ব্যাংকগুলোকে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করতে নির্দেশনা দেয়। ওই নির্দেশনায় প্রণোদনার ঋণ যাতে গ্রহীতারা অপব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়ে নজরদারি জোরদার করতেও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা যায়, আইএফআইসি ব্যাংকের ৩টি শাখা থেকে বিতরণ করা প্রণোদনার ঋণ গ্রহীতারা তাদের পূর্বের ঋণের সাথে সমন্বয় করেছেন। অর্থাৎ আইএফআইসি ব্যাংক থেকে প্রণোদনার ঋণ নিয়ে তারা অন্য ব্যাংকের পূর্বের ঋণ পরিশোধ করেছেন, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানা যায়, গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আইএফআইসি ব্যাংক সরকার ঘোষিত প্রণোদনার মোট ৮৩ কোটি এক লাখ টাকা বিতরণ করেছে। এই ঋণ বিতরণে ব্যাংকটির মতিঝিলের ফেডারেশন শাখা, গুলশান শাখা ও নারায়ণগঞ্জ শাখায় বিভিন্ন অনিয়ম ও অপব্যবহার খুঁজে পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, যেসব ব্যাংকগুলো প্রণোদনার ঋণ বিতরণে অনিয়ম করেছে তাদের বিরুদ্ধে শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের সুদের ভর্তুকি বাতিল করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

প্রণোদনার ঋণে ফেডারেশন শাখায় অনিয়ম:
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা যায়, আইএফআইসি ব্যাংকের ফেডারেশন শাখা গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রণোদনার তহবিল থেকে আনোয়ার সিমেন্ট লিমিটেডকে ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করে। এই ঋণ থেকে গ্রাহক রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট- আরটিজিএস এর মাধ্যমে ১ কোটি টাকা এনসিসি ব্যাংকে তার অন্য অ্যাকাউন্ট এবং ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা গ্রাহকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আনোয়ার ইস্পাত লিমিটেডের ট্রাস্ট ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে। মাত্র দুই দিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি এভাবে প্রণোদনা ঋণ দিয়ে আগের ঋণ সমন্বয় করে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশের লঙ্ঘন।

এছাড়া প্রণোদনার ঋণ থেকে শাখাটি উত্তরা স্পিনিং মিলস লিমিটেডকে ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ব্যাঙ্গো মিলার্স লিমিটেডকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ব্যাঙ্গো বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস লিমিটেডকে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ডিউরেবল প্লাস্টিক লিমিটেডকে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রণোদনার এই ঋণগুলো নিয়ে গ্রাহকরা তার বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেছেন। ফলে বিতরণকৃত ঋণ যথাযথভাবে ব্যবহার হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করতে পারেনি ব্যাংকটি।

গুলশান শাখার অনিয়ম:
আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখায় প্রণোদনার তহবিল থেকে এসকিউ সেলসিয়াস লিমিটেডকে ১০ কোটি টাকা এবং সোনিয়া অ্যান্ড সোয়েটারস লিমিটেডকে ৫ কোটি টাকা বিতরণ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রমাণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রণোদনার ঋণ পাওয়ার পর, এসকিউ সেলসিয়াস লিমিটেড ডাচ-বাংলা ব্যাংক এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আগের ঋণ সমন্বয় করতে তহবিলের অর্থ ব্যবহার করেছে। আর সোনিয়া অ্যান্ড সোয়েটারস লিমিটেড শ্রমিকদের বেতন ও মজুরি দেওয়ার কথা বলে প্রণোদনার ঋণ নিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল প্রণোদনার সঠিক ব্যবহারের প্রমাণ পায়নি।

নারায়ণগঞ্জ শাখায় প্রণোদনার তহবিলের অপব্যবহার:
আইএফআইসি ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখা সরকার ঘোষিত প্রণোদনার তহবিল থেকে রনি নিট কম্পোজিট (প্রা.) লিমিটেডকে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং নিট কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিটকে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বিতরণ করে। কর্মচারিদের বেতন পরিশোধের কথা বলে ঋণ নেওয়ার সময় গ্রাহকরা শাখাকে জানিয়েছিলো। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল এ বিষয়ে কোনো সহায়ক নথি খুঁজে পায়নি।

প্রণোদনার ঋণে এমন অনিয়মের বিষয়ে আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও শাহ এ সারওয়ারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

আইএফআইসি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ মো. মঈনুদ্দিন বলেন, আমি যতদূর জানি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণোদনার ঋণ বিতরণের বিষয়ে আমাদের ব্যাংকে একটি অডিট করেছে। কিন্তু কোন অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে কিনা তা আমার জানা নাই। ইতোমধ্যে প্রণোদনার ঋণ বেশিরভাগ সমন্বয় করা হয়েছে।

ব্যাংকের ফেডারেশন শাখার ব্যবস্থাপক জুলফিকার আলী বলেন, আমরা অডিট শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি, বিষয়টি নিয়ে আর কিছু বলতে পারছি না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রণোদনা ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। কিছু বড় ঋণগ্রহীতা পূর্ববর্তী ঋণ সামঞ্জস্য করার জন্য প্রণোদনার তহবিলকে ব্যবহার করেছে। এতে তহবিলের সঠিক ব্যবহার হয়নি। এছাড়া তহবিলের যথাযথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঋণদাতাদের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি আরও জোরদার করা উচিত ছিলো বলে মনে করেন সাবেক এই গভর্নর।

১ টি মতামত “প্রণোদনার ঋণে আইএফআইসি ব্যাংকের অনিয়ম!”

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.