আজ: সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ইং, ২৩শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৩ই রজব, ১৪৪৪ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

১৯ ডিসেম্বর ২০২২, সোমবার |


kidarkar

ব্যাংকের দৃষ্টি কৃষি খাতে

কৃষিতে ঋণের প্রবাহ বেড়েছে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি


শাহ আলম নূর : দেশের ব্যাংকিং খাতের দৃষ্টি কৃষি খাতে। এখাতে বিতরনকৃত ঋণের আদায়ের পরিমান অন্য যে কোন খাতের চেয়ে বেশি। খেলাপি ঋণের পরিমান বলতেগেলে অনেক কম। এসব কারনে বাণিজ্যিক ব্যাংগুলো কৃষি খাতে ঋণ বিতরন বেশ নিরাপত বলে মনে করছেন।
সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ঋণ পরিশোধের দিক থেকে বরাবরই সেরা পারফরম্যান্স আসে কৃষি খাত থেকে। খাতভিত্তিক ঋণ বিতরণের অনুপাতে আদায়ের হারের দিক থেকে কৃষির অবস্থান প্রতি বছরই শীর্ষে। এমনকি কভিডের প্রাদুর্ভাবজনিত অর্থনৈতিক দুর্বিপাকের মধ্যেও কৃষি খাত থেকে ঋণের অর্থ আদায় হয়েছে বিতরণের চেয়ে বেশি। গ্রাহক হিসেবে কৃষকরা সেরা হলেও এখনো দেশের কৃষি জিডিপির বিপরীতে কৃষি ঋণের হার ১০ শতাংশেরও অনেক নিচে।
তবে কৃষি খাতে ঋণ বিতরনের চিত্র পরিবর্তন হচ্ছে। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে কৃষি খাতে ঋণ বিতরন যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
চলতি ২০২২-২৩ অর্থ বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়কালে আনুষ্ঠানিক ভাবে কৃষি খাতে ঋণ বিতরন বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে দেশের কৃষি খাত বর্তমানে একটি সুসময় পার করছে।
কৃষি খাতে ঋণ বিতরনের কাংক্ষিত উন্নয়ন এমন এক সময়ে এসেছে যখন স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলি বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে। মূলত কোভিড এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। এতে কৃষি খাতও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) এর পরিসংখানে দেখা যায় সর্বশেষ তথ্যানুসারে দেশে অকৃষি খাতে ঋণ বিতরনের পরিমান আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৪৯ শতাংশ কমেছে।
তথ্যে দেখা যায় চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলি মোট ৯৪.৬৯ বিলিয়ন টাকা বিতরণ করেছে। বিতরনকৃত ঋণের ৭৮.২০ বিলিয়ন টাকা দেয়া হয়েছে কৃষি খাতে। একই সময়ে ১৬.৪৯ বিলিয়ন টাকা বিতরন করা হয়েছে অকৃষি খাতে।
আগের অর্থবছর ২০২১-২২ একই সময়ে কৃষি ও অকৃষি খাতে ঋণ বিতরণের পরিসংখ্যান ছিল যথাক্রমে ৬১.৬০ বিলিয়ন এবং ১৭.৪৪ বিলিয়ন টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশকে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে সহায়তা করার জন্য সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক’র পক্ষ থেকে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিকে কৃষি খাতে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার গত মাসের শেষের দিকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ বৈঠকে আগামী দিনে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের মধ্যে ঋণের প্রবাহ আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়।
তিনি বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণরের এমন নির্দেশনার পর কৃষি খাতে ঋণ বিতরনের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা আগামী ক্যালেন্ডার বছর থেকে বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমরা এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই যেখানে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও কৃষক অসুবিধার সম্মুখীন হবেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে দেশের ব্যাংকগুলিকে কৃষি খাতে মোট ঋণের ন্যূনতম ২.৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হবে এবং কৃষি ঋণের ৩০ শতাংশ ব্যাংকগুলিকে নিজেরাই বিতরণ করতে হবে।
দেশের ৬০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে তারল্য সহায়তা বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ৫০০০ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পও গঠন করেছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আরএফ হুসেন বলেন জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান থাকা সত্ত্বেও আনুষ্ঠানিক ঋণ প্রবাহের ক্ষেত্রে কৃষি খাত যথেষ্ট মনোযোগ পচ্ছে না।
তিনি বলেন “এটি একটি ভাল লক্ষণ যে কৃষি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ছে। ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ নিশ্চিত করার জন্য আমাদের আরও মনোযোগ দিতে হবে”।
বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক ডক্টর এম আসাদুজ্জামান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকদের বিশেষ করে আমন চাষিদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
তিদনি বলেন নীতিনির্ধারকদের উচিত কৃষকদের ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো এবং পদ্ধতি সহজ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। যাতে কৃষকরা ঋণ পরিশোধে কোনো সমস্যার সম্মুখীন না হয়।
দ্য ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও) এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২২ সালে দেশের চাল উৎপাদন ১.৪ শতাংশ বাড়বে বলে অনুমানকরা হচ্ছে। ধান উৎপাদনের দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর ৩৮.৪ মিলিয়ন টন ধানউৎপাদন হয়ে থাকে। একই সাথে স্বাদুপানির মাছ ও সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিতরণকৃত ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বরাবরই কৃষির অবস্থান সবচেয়ে ভালো। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ হয়েছিল ২২ হাজার ৭৪৯ কোটি ৩ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২১ হাজার ২৪৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে (২০২০-২১) কভিডকালীন দুর্বিপাকের মধ্যেও কৃষকদের কাছ থেকে বিতরণকৃতের চেয়েও বেশি অর্থ ফেরত পেয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ওই সময় কৃষি খাতে ২৫ হাজার ৫১১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ হলেও আদায় হয়েছে ২৭ হাজার ১২৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সর্বশেষ গত অর্থবছরে (২০২১-২২) ২৮ হাজার ৮৩৪ কোটি ২১ লাখ টাকা ঋণ বিতরণের বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৭ হাজার ৪৬৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
ঋণ আদায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালো হলেও কৃষি খাতে ঋণের সম্প্রসারণ হচ্ছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত অর্থবছরে দেশে কৃষি খাতে মোট জিডিপির পরিমাণ ছিল (চলতি মূল্যে) ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সে হিসেবে এ সময় কৃষি খাতে জিডিপির বিপরীতে ঋণ বিতরণের হার ছিল ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আগের দুই অর্থবছরে এ হার ছিল যথাক্রমে ৬ দশমিক ২১ শতাংশ ও ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ।


আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.