আজ: রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪ইং, ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২০শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

০৯ মার্চ ২০২৩, বৃহস্পতিবার |

kidarkar

গমের সরবরাহ সংকট ও উচ্চমূল্যে কমছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন

নিজস্ব প্রতিবেদক : ডলার সংকটে আমদানি কমে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে গমের সরবরাহ সংকট, প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে আটা-ময়দার দাম। এর প্রভাবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য তথা ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিতে ব্রেড, বিস্কুট, কেক, নুডলস সহ বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন কমে গেছে বলে জানা যায়।

ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিতে বিভিন্ন ধরনের স্ন্যাকস আইটেম উৎপাদন করে বসুন্ধরা ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি গম আমদানি করে, নিজেদের ফ্লাওয়ার মিলেই আটা-ময়দা তৈরি করে বাজারজাত করে। আবার এই র’ ম্যাটেরিয়ালস ব্যবহার করে প্রসেসড ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে নুডলস, পাস্তা, সেমাই, মেকারনি উৎপাদন করে বাজারজাত করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানান, ‘নতুন করে গম আমদানি করতে না পারায় নিজেদের মজুত শেষ পর্যায়ে নেমে এসেছে। ময়দা বাজারজাত করতে পারলেও আটা সরবরাহ তলানিতে নেমেছে। গম না থাকায় ফ্লাওয়ার মিল বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।’

একইসঙ্গে, চানাচুর, নুডলস সহ কয়েকটি প্রসেসড ফুডের উৎপাদন ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানিগুলো বলছে, শুধু গম নয়, চিনিরও সংকট রয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহৃত এই কাঁচামাল দুটির সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে এবং যেটুকু পাওয়া যায় তারও আবার চড়া দাম। যে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে।

কোম্পানিগুলো বলছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বেশ কয়েক মাস গমের আমদানি বন্ধ ছিল। সে সময় আমদানিকারকদের কাছে গমের মজুত ছিল। আবার যখন রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে আমদানি উন্মুক্ত হয়েছে তখন ডলার সংকটে এলসি খুলতে না পারায় বেসরকারি খাতের আমদানি কমতে থাকে। এই অবস্থাতেই মূলত সংকট তৈরি হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় নিয়মিত তাদের ওয়েবসাইটে গম আমদানির তথ্য প্রকাশ করে থাকে। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে দেশে গম আমদানি হয়েছে ১৯.১৮ লাখ টন। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের আমদানি মাত্র ১৩.৩৯ লাখ টন। যেখানে গত অর্থবছরের কয়েক মাস আমদানি বন্ধ থাকার পরও ৪০ লাখ টন গম আমদানি হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রতি বছর গমের চাহিদা ৭০-৭৫ লাখ টন। এর মধ্যে দেশে উৎপাদন হয় মাত্র ১০-১২ লাখ টন, বাকিটা আমদানি করতে হয়।

আমদানিকারকরা বলছেন, আমদানির পরিমাণেই সংকটের চিত্র ফুটে উঠছে। যার প্রভাব পড়ছে আটা ময়দার বাজারে, প্রসেসড ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে।

বসুন্ধরা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার রেদওয়ানুর রহমান বলেন, ‘ডলার ক্রাইসিসের কারণে গমের আমদানি একেবারেই কমে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে গম আমদানি করার সুযোগ তৈরি হলেও সেটাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। যে কারণে সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে।’

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও মনিটরিং ইউনিটের প্রতিদিনের রিপোর্টে চাল ও গমের আমদানি, আমদানিকারক, আমদানি অবস্থায় থাকা জাহাজের অবস্থান তুলে ধরা হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি খাতে আমদানিকৃত খাদ্যবাহী জাহাজের অবস্থানের চিত্রে বলা হয়েছে, গম নিয়ে আসার মতো পথে বা পোর্টে কোন জাহাজ নেই।

যদিও আকিজ রিসোর্স লিমিটেডের চিফ স্ট্র্যাটেজি অফিসার মিনহাজ আহমেদ জানান, জাহাজে তাদের একটি চালান আসছে কানাডা থেকে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে গমের যে চাহিদা রয়েছে তার মধ্যে ৭৫ ভাগ আটার ব্যবহার এবং ২৫ ভাগ হলো ময়দার।

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিস্কুট বাজারজাত করছে ইফাদ মাল্টি প্রোডাক্টস লিমিটেড। একই সঙ্গে ইনস্ট্যান্ট নুডুলস এবং আটা-ময়দা বাজারজাত করে থাকে তারা।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘একদিকে গমের সরবরাহ ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অন্যদিকে গম, চিনি সহ বিভিন্ন র’ মেটেরিয়ালসের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। এর ৫০ শতাংশ আমরা দামের মাধ্যমে সমন্বয় করতে পেরেছি, মার্কেটের প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার কারণে বাকি ৫০ শতাংশ সমন্বয় করতে পারছি না। কিন্তু এই অবস্থায় টিকে থাকতে গিয়ে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে।’

বিভিন্ন ধরনের স্ন্যাকস বাজারজাত করছে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেড। স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার পারভেজ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গমের সরবরাহে ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে। আমরা চাহিদা অনুযায়ী পাচ্ছি না। কাঁচামাল যদি চাহিদা অনুযায়ী না পাই তাহলে তো সেটা প্রডাকশনের উপর প্রভাব ফেলবেই।’

আটা-ময়দার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয় ব্রেড, কেক এবং বিস্কুট তৈরিতে। বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সরবরাহ ক্রাইসিস থেকেই আটা-ময়দার দাম চড়া, এক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণ দাম দিয়ে কাঁচামালগুলো কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আছে চিনির সংকট। আবার চাইলেই পণ্যের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। এই অবস্থায় আমরা উৎপাদন ২৫-৩০ শতাংশের মতো কমিয়ে দিয়েছি।’

এসিআইয়ের বিজনেস ডিরেক্টর ফারিয়া ইয়াসমিন বলেন, ‘এসিআই স্থানীয় আমদানিকারকদের কাছ থেকে গম কিনে মিলিং করে আটা-ময়দা বাজারজাত করে। আমরা গমের একটা সরবরাহ সংকট দেখতে পাচ্ছি। যে কারণে বাজারে আটার সরবরাহও কম।’

প্রতিষ্ঠানটি কেক সহ কয়েকটি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বাজারজাত করে, যাতে আটা-ময়দার ব্যবহার করতে হয়।

তিনি বলেন, ‘চিনি, ডিম ও গমের বাড়তি দামের কারণে প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির খরচ ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এ কারণে আমরা উৎপাদনেও কিছুটা লাগাম টেনেছি।’

খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো বলছে, সব ধরনের র’ মেটেরিয়ালসের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রথমদিকে কোম্পানিগুলো দাম বাড়াবে নাকি পণ্যের পরিমাণ কমাবে সেটা নিয়ে দ্বিধায় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত দুই পদ্ধতির সমন্বিত ব্যবহার করে কোম্পানিগুলো এমন অবস্থায় এসেছে, যেখান থেকে পণ্যের দামও বাড়ানো সম্ভব নয়, আবার পণ্যের পরিমাণও কমানো সম্ভব নয়।

ফারিয়া ইয়াসমিন বলেন, ‘সমন্বয়ের একটা চূড়ান্ত ধাপ রয়েছে, সেই ধাপটাতে আমরা পৌঁছেছি। দাম বাড়ালে প্রতিযোগিতার বাজারে টেকা যাবে না, আর একটা ছোট কেককে আর ছোট করার অবস্থা নেই।’

ডলার সংকটে গমের আমদানি কমে যাওয়ায় সুপার স্টোর, গ্রোসারি শপগুলোতে আটার সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। আটা-ময়দার দাম এখন বাড়তে বাড়তে এটা চালের দামকেও ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে চালের চেয়ে দাম বেশি হওয়ায় অনেক ভোক্তাও আটা-ময়দার ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে।

গত বছরের এই সময়ে এক কেজি প্যাকেটের আটা কিনতে খরচ হতো ৪০-৪৫ টাকা, এই দাম এখন গিয়ে ঠেকেছে ৬৮-৭৮ টাকায়। আর খোলা আটার দাম ৩৪-৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ৬০-৬২ টাকায় উঠেছে। যেখানে মোটা ও মাঝারি মানের কিছু চাল পাওয়া যাচ্ছে ৫০-৬০ টাকার মধ্যে।

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার বিশ্লেষণের তথ্য বলছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় খোলা আটার দাম ৬৮.৫৭ শতাংশ, প্যাকেট আটার দাম ৫৫.২৯ শতাংশ, খোলা ময়দার দাম ৩৮ শতাংশ এবং প্যাকেট ময়দার দাম প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র এজিএম তাসলিম শাহরিয়ার বলেন, ‘একদিকে যেমন আমদানি সংকট আছে সেটা ঠিক, আবার সাধারণ মানুষও বেশি দামের কারণে আটা খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। এখন মানুষ ভাতের উপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। যেহেতু আটার চেয়ে চাল আরও কম দামে পাওয়া যাচ্ছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেশ কয়েক মাস আমদানি বন্ধ ছিল। কারণ বাংলাদেশে ভালো মানের গম আমদানির প্রধান উৎসই ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন। কানাডা থেকে গম আমদানি হলেও তার দাম অনেক বেশি। এর বাইরে আমদানির বড় উৎস হয়ে ওঠা প্রতিবেশি দেশ ভারতও নিজেদের সুরক্ষার জন্য গমের রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।

বর্তমানে ভারত ছাড়া সবগুলো সোর্সিং কান্ট্রি থেকে আমদানির সুযোগ থাকলেও সরকারের ডলার সংকটের কারণে আমদানি কমেছে। আর যেটুকুই আমদানি হচ্ছে তার দামটাও ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে বেশি পড়ছে।

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.