আজ: রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪ইং, ৯ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

০১ জুন ২০২৩, বৃহস্পতিবার |

kidarkar

যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’ এই শিরোনামকে সামনে রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবার বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

বৃহস্পতিবার (০১ জুন) জাতীয় সংসদে এই বাজেট উপস্থাপন করবেন তিনি। এর আগে জাতীয় সংসদে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী ।

আইএমএফের শর্ত পূরণের পাশাপাশি জনস্বার্থে ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন ধরনের পণ্যে শুল্ক ও কর আরোপ, কিংবা ছাড়ের প্রস্তাবনা দেবেন অর্থমন্ত্রী। এর ফলে অনেক পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

দাম বাড়তে পারে যেসব পণ্যের

মোবাইল ফোন: প্রতি বছর মোবাইল ফোন পাল্টানো ফ্যাশনের অংশ, যা শখে পরিণত হয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে আইএমএফ-এর পরামর্শে মোবাইল ফোনকে বিলাসী পণ্য বিবেচনায় নিয়ে বাজেটে ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। বর্তমানে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি আছে, সেখানে ২ শতাংশ ভ্যাট বসানো হচ্ছে। আর সংযোজন পর্যায়ে ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ এবং ৫ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। এ কারণে খুচরা পর্যায়ে মোবাইল ফোনের দাম বাড়তে পারে।

লেখার কলম: বাচ্চার জন্য কলম কেনার খরচও বাড়বে। কলম উৎপাদনে বর্তমানে ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে, সেখানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসানো হচ্ছে। এতে কলমের দাম বাড়তে পারে।

গৃহস্থালি সামগ্রী: গৃহস্থালি সামগ্রীর ক্ষেত্রে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের তৈরি সব ধরনের টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, গৃহস্থালি সামগ্রী উৎপাদনে ৫ শতাংশ ভ্যাট আছে, এটি বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। একইহারে অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী ও তৈজসপত্রের (হাঁড়িপাতিল, থালাবাসন) ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে। কিচেন টাওয়াল, টয়লেট টিস্যু, ন্যাপকিন টিস্যু, ফেসিয়াল টিস্রু/পকেট টিস্যু ও পেপার টাওয়াল উৎপাদনে ৫ শতাংশ ভ্যাট আছে, এটি বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে টিস্যু পেপারের দাম বাড়তে পারে।

মাইক্রোওয়েভ ওভেন: শহরে বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত বাড়িতে খাবার গরম করতে মাইক্রোওয়েভ ওভেন ব্যবহার করা হয়। শুল্ক ফাঁকি রোধে বাজেটে সব ধরনের ওভেন আমদানির শুল্ক ৩০ শতাংশ বাড়াচ্ছে, মোট করহার ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ করছে। এতে বিদেশি ওভেনের দাম বাড়তে পারে।

এলপি গ্যাস সিলিন্ডার: সারা দেশে রান্নার কাজে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয়। বাজেটে সিলিন্ডার উৎপাদনে ব্যবহৃত স্টিল ও ওয়েল্ডিং ওয়্যার আমদানিতে শুল্ক আরোপ এবং উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে। এতে বাজারে সিলিন্ডারের দাম বাড়তে পারে।

বাসমতি চাল: সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বা উৎসব-পার্বণে বিরিয়ানি, তেহারি খেতে পছন্দ করেন অনেকে। এই শখের খাবার খেতেও বাড়তি খরচ করতে হবে। কারণ, বিরিয়ানি-তেহারির প্রধান উপকরণ বাসমতি চাল আমদানিতে ভ্যাট বসানো হচ্ছে। এতে চালের দাম বাড়তে পারে। ফলে বাড়তে পারে বিরিয়ানি কিংবা কাচ্চির দামও।

কাজু বাদাম: সুস্বাস্থ্যের জন্য কাজু বাদাম অনেকের কাছেই প্রিয়। দেশে বাদাম চাষকে উৎসাহিত করতে কাজু বাদাম আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৩ শতাংশ করা হচ্ছে। তাই আমদানি করা কাজু বাদামের দাম বাড়তে পারে।

খেজুর: সুস্বাস্থ্যের জন্য খেজুর খান অনেকে। বাজেটে তাজা ও শুকনা খেজুর আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। মূলত শুল্ক ফাঁকি রোধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বিদেশি ফল: এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ফল ও বাদামের আমদানি শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে বিধায় ফল ও বাদামের দাম বাড়তে পারে।

সিগারেট: বাজেটে সব ধরনের সিগারেটের দাম বাড়ানো হচ্ছে। নিম্নস্তরের এক প্যাকেট (২০ শলাকার) সিগারেটের (যেমন-হলিউড, ডার্বি) দাম ৯০ টাকা, মধ্যম স্তরের (স্টার, নেভি) ১৩৪, উচ্চস্তরের (গোল্ডলিফ) ২২৬ এবং অতি উচ্চস্তরের (বেনসন, মালবোরো) সিগারেটের দাম ৩০০ টাকা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ানো হচ্ছে জর্দা-গুলের দামও। তবে বিড়ির দাম অপরিবর্তিত থাকবে।

চশমা: চশমার ফ্রেম ও সানগ্লাস আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এছাড়া উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। এতে সব ধরনের চশমার দাম বেড়ে যেতে পারে।

নির্মাণ সামগ্রী: বাজেটে বাড়ি নির্মাণের খরচ বাড়ানো হবে। বাড়ি নির্মাণের প্রধান উপকরণ সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতে বর্তমানে টনপ্রতি ৫০০ টাকা শুল্ক আছে, এটি বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। এ কারণে সিমেন্টের দাম বাড়তে পারে। বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত বিদেশি টাইলস আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এ কারণে বিদেশি টাইলসের দাম বাড়তে পারে। যদিও গত একবছরে রড, সিমেন্ট, ইট ও অন্যান্য পণ্যের দাম এমনিতেই বেড়ে গেছে। এর মধ্যেই সিমেন্টের কিছু পণ্যের ওপর ভ্যাট বাড়তে পারে আগামী বাজেটে।

ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও চট্টগ্রাম ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (সিডিএ) এলাকায় জমি নিবন্ধনের ট্যাক্স বিদ্যমান ৩ শতাংশ ও ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে যথাক্রমে ৪ শতাংশ ও ৫ শতাংশ হতে পারে। এছাড়া ফ্ল্যাট বিক্রিতে বিদ্যমান গেইন ট্যাক্স বাড়তে পারে। ফলে আগামী অর্থবছর থেকে উভয় ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ গুণতে হবে।

বিদেশ ভ্রমণ: ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের বাজেটে বাড়তি করের চাহিদা মেটাতে বিদেশগামী যাত্রীদের ওপর ৩০০-৫০০ টাকা বাড়তি কর আরোপ করতে যাচ্ছে সরকার। এতে বিদেশে যাওয়া-আসা খরচ বেড়ে যেতে পারে। তবে হজ কিংবা চিকিৎসার জন্য যারা বিদেশ ভ্রমণ করবেন, তারা আগের মতোই কর সুবিধা পাবেন।

বাই সাইকেল: বাই সাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। এতে পরিবেশ রক্ষা করা বাহনের দাম বেড়ে যেতে পারে।

সিরিশ কাগজ: সিরিশ কাগজ আমদানিতেও শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে সিরিশ কাগজের দাম বেড়ে যেতে পারে।

আঠা: ভাঙা জিনিস জোড়া দেওয়ার আঠা বা গ্লু সংরক্ষণমূলক শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে। ফলে আঠার দাম বাড়তে পারে।

দামি গাড়ি: আগামী অর্থবছরের বাজেটে দামি গাড়ির ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ হতে পারে। এতে দামি গাড়ির দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০০১ সিসি থেকে ৩০০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ি আমদানিতে এখন ২০০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসে। এটা বাড়িয়ে ২৫০ শতাংশ এবং ৩০০১ থেকে ৪০০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করে ৫০০ শতাংশ করা হতে পারে।

২০০০ সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতাবিশিষ্ট গাড়ি সাধারণত জিপ গাড়ি হয়। এখন দেশে বিপুলসংখ্যক জিপ গাড়ি কিংবা এসইউভি মডেলের গাড়ি আসছে।

এদিকে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশের ৫২তম বাজেট এটি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের শেষ বাজেট এটি। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের এটি পঞ্চম বাজেট।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশে মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট দেন তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭২ সালের ৩০ জুন ওই বাজেট পেশ হয়। তাজউদ্দীন আহমদ ওই দিন একই সঙ্গে ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছর, অর্থাৎ দুই অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। এরপর আরও দুবার বাজেট দেন তাজউদ্দীন আহমদ, সেটি সবশেষ দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকার। ১৩ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার বাজেট দিয়েছেন সদস্য প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও এম সাইফুর রহমান। দুজনেই ১২টি বাজেট উত্থাপন করেছেন। তবে আবুল মাল আবদুল মুহিতই আওয়ামী লীগের হয়ে টানা ১০ বার বাজেট পেশ করেছেন। তিনি প্রথম বাজেট দেন ১৯৮২-৮৩ সালে, এরশাদের শাসনামলে। সেটার আকার ছিল ৪ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। আর সবশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তার বাজেটের আকার ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার।

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.