আজ: সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১ইং, ১১ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৫ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

০২ মার্চ ২০২১, মঙ্গলবার |



kidarkar

লভ্যাংশ ঘোষণায় বেঁধে দেওয়া সীমার আদেশ পর্যালোচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ ঘোষণায় সীমা বেঁধে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে আদেশ দিয়েছে, পুঁজিবাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পর সেটি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

উল্লেখ, ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক এক আদেশে জানায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে। তবে নগদে শেয়ার প্রতি দেড় টাকার বেশি দেয়া যাবে না। ২৪ ফেব্রুয়ারি আরেক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও শেয়ার প্রতি সর্বোচ্চ দেড় টাকা লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে। তবে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ হলে কোনো লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশনাতে সহমত নয়। কমিশনের মতে, পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হবে।

জানা যায়, ইতোমধ্যে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসেসিয়েশন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই নির্দেশনা পাল্টানোর আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে।

চিঠি দিয়েছে বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদও।

বিষয়টি পর্যালোচনা চায় বিএসইসিও। যদিও এ বিষয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে বা হবে কি না সে বিষয়ে কিছু বলতে চাননি সংস্থাটির কমিশনার শামসুদ্দিন আহমেদ।

পুঁজিবাজার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বিএসইসির সঙ্গে আলোচনা করে অন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা নেবে- এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে ২০১৫ সালেই। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিষয়টি মেনে চলেনি।

তবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ ঘোষণার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে এখন সরে আসার ইঙ্গিত দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে, ‘বিষয়টি পযালোচনা করা হবে’।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিএসইসি কোনো আবেদন করেছে কিনা এ ব্যাপারে আমার জানা নেই। তবে যদি আবেদন করে বাংলাদেশ ব্যাংক সেটা পর্যালোচনা করে দেখবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যেন সার্বিকভাবে ভালো হয় সেদিকে গুরুত্ব দেবে’।

লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে লভ্যাংশ ঘোষণা করবে, তা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, স্টেক হোল্ডারসহ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত যাদের শেয়ার আছে তারা নিয়ে যায়। একটি প্রতিষ্ঠান মজবুত করার জন্য, ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটি যেন আরো শক্তিশালী অবস্থায় থাকে এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এজন্য লভ্যাংশ দেয়ার কিছু ধাপ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। ওইসব প্রতিষ্ঠানের সাময়িক মনে করছে যে তারা বেশি লভ্যাংশ দিতে পারছে না। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি মজবুত করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ব্যাংক যতই মুনাফা করুক শেয়ার প্রতি দেড় টাকা নগদ আর প্রতি ১০০ শেয়ারের বিপরীতে ১৫টি বোনাস শেয়ার দিতে পারবে।

তব এটা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ (১০০ শেয়ারে ৫টি) বোনাস দেয়া যাবে। কোনো কোনো ব্যাংক এর সঙ্গে ৫ শতাংশ নগদ (শেয়ার প্রতি ৫০ পয়সা) কোনো ব্যাংক ৬ শতাংশ বোনাস ও শেয়ার প্রতি ৬০ পয়সা নগদ, কোনো কোনো ব্যাংক শেয়ার প্রতি ৭৫ পয়সা নগদ ও ৭.৫ শতাংশ বোনাস, কোনো কোনো ব্যাংক শেয়ার প্রতি এক টাকা নগদ ও ১০০ শেয়ারে ১০টি বোনাস শেয়ার দিতে পারবে।

এই নির্দেশনা আসার পর এই খাতের শেয়ার দরে নেতিবাচক প্রবণতার মধ্যে ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্দেশনা আসে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ শেয়ার প্রতি দেড় টাকা নগদ লভ্যাংশ হিসেবে দিতে পারবে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার দিতে হবে।

তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন পর্যাপ্ততা্র হার ১০ শতাংশের কম বা যাদের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি, তারা কোনো লভ্যাংশই দিতে পারবে না।

ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের সীমা দেয়ার পর দুই কার্যদিবস এই খাতের শেয়ারের দরও পড়েছে।

এ বিষয়ে মার্চেন্ট ব্যাংক অ্যাসোসিয়েনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিন ধরেই দেশের পুঁজিবাজার অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সব স্তরেই প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। নতুন কমিশন যোগদানের পর বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এতে পুঁজিবাজারের কিছুটা উন্নতি লক্ষণীয়। এ উন্নতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতাও আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করছি। তবে লভ্যাংশ ঘোষণার নতুন নীতিমালা আসার পর থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ওপরে চরম নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছে, যা পুরো শেয়ারবাজারের জন্যই নেতিবাচক হচ্ছে।’কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিমালা ঘোষণার আগে আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ফিনান্স শেয়ার প্রতি সাড়ে তিন টাকা লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তারা শেয়ার প্রতি আয় করেছে ৭ টাকার বেশি।

লভ্যাংশ বিতরণের এই সিদ্ধান্তকে ‘পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক’ উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, ‘আমরা মনে করি, যদি কারও আয় থাকে, তার লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ থাকা দরকার। এ রকম সাধারণ ঘোষণা দিয়ে লভ্যাংশ টেনে ধরলে বিনিয়োগকারী হতাশ হবে এবং পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকস অ্যাসোসিয়েশনের  সভাপতি ছায়েদুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেয়া হয়েছে। পুঁজিবাজারে যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের লভ্যাংশ দেয়ার ক্ষেত্রে যেন কোনো বাধা না থাকে সে জন্যই চিঠি দেয়া হয়েছে।’

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে লভ্যাশ বিতরণে আগের নিয়ম বহাল রাখার অনুরোধ করেছি। প্রতিষ্ঠান তার সক্ষমতা অনুযায়ী লভ্যাংশ দেবে। এতে বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক কী বলেছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছে তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে।’

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যার প্রভাব ইতোমধ্যেই পুঁজিবাজারে লক্ষ্যনীয়। ‘কোম্পানির সামর্থ্য আছে বলেই লভ্যাংশ দিয়েছে। কোম্পানি ঝুঁকি বিবেচনা করেই লভ্যাংশ প্রদান করে। বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি বিবেচনা করে প্রভিশন সংরক্ষণের নির্দেশনা দিতে পারে। খেলাপি ঋণ কমানোর পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু লভ্যাংশ বেঁধে দিতে পারে না।’

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.