বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বমানের ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট তৈরির চর্চা হচ্ছে: আকতার হোসেন সান্নামাত

Akhter Hossin sannamat1শেয়ারবাজার রিপোর্ট: দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন দেশের বেশকিছু স্বনামধণ্য লিজিং কোম্পানিতে। বর্তমানে ব্যবস্থাপনা প্ররিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেডে এর পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ড হিসেবে সফলতার পাল্লা ভারী করেছেন দেশী-বিদেশী বিভিন্ন  পুরষ্কারে। আর্থিক প্র্রতিবেদন নিয়ে তার কাজ এখন দেশজুড়ে সমাদৃত। সম্প্রতি কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা-অর্জন নিয়ে কথা বলেছেন শেয়ারবাজারনিউজের দুই সাংবাদিক আহসান হাবিব ও ওয়াহিদুল হকের সাথে। তারই চুম্বক অংশ তুলে ধরা হল বুলেটিনের পাঠকদের উদ্দেশ্যে।

শেয়ারবাজারনিউজ: আপনি একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ড। তাই নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে আপনি কি কোন সফলতা দেখাতে পেরেছেন?
আকতার হোসেন সান্নামাত: প্র্রথমত চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ড হিসেবে যারা কাজ করে, তাদের কাজের মেয়াদ বলতে কিছু নেই। অর্থাৎ একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ড চাইলে জীবনের শেষ দিন প্রর্যন্ত কাজ করে যেতে পারেন। একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ড হিসেবে আমার লক্ষ্য ছিল দেশের কর্পোরেট জগতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং এর ক্ষেত্রে বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসা। আর এ বিষয়ে আমি সফলতার সাথে কাজ করতে পেরেছি। প্র্রাইম ফাইন্যান্সে থাকাকালীন সময়ে আমি সর্বপ্রথম বিশদ তথ্য সংযোজন করে বার্ষিক নিরীক্ষিত প্র্রতিবেদন প্র্রস্তুত করি। তখন অন্য কোম্পানিগুলোও আমাদের মতো বার্ষিক প্র্রতিবেদন তৈরির জন্য অনুপ্রাণিত হয়। এর আগে কোম্পানিগুলো প্র্রায় দায়সারাভাবেই কিছু তথ্য দিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট তৈরি করতো। সেখানে ব্যবসা সম্পর্কে বিশদ কিছু থাকতো না। আর এখন কোম্পানিগুলো বিশেষ করে ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি ইত্যাদি প্র্রতিষ্ঠানগুলো ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টে অনেক বিশদ তথ্য সংযোজন করছে। অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বমানের ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট তৈরির চর্চা হচ্ছে।
যদিও বড় বড় গ্রুপ কিংবা কোম্পানিগুলো ইন্ডিয়া থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ড এনে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট তৈরি করছে। তবে এখানে খেয়াল রাখতে হবে কোম্পানির বার্ষিক প্র্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবসার ধরণ অনুযায়ী অভিজ্ঞ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট নিয়োগ দিতে হবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানগুলো কি লিজিং ব্যবসা থেকে সরে আসছে?
আকতার হোসেন সান্নামাত: লিজিং বেসিক্যালি একটা প্রোডাক্ট। বিশ্বে এই প্রোডাক্টটিকেই কেন্দ্র করে অনেক প্র্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে। কিন্তু লিজিং ব্যাবসাটি এদেশে এনবিএফআই এর কাছে তার আকর্ষণীয়তা হারিয়েছে। এ কারণে আমাদের দেশের আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানগুলো লিজিং ফাইন্যান্স এর প্র্রতি আগ্রহ ধরে না রেখে অন্য অনেক প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করছে। তাই এনবিএফআই এর টোটাল রেভিনিউতে লিজিং ফাইন্যান্স মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ অবদান রাখতে প্রারছে।
শেয়ারবাজারনিউজ: লিজিং ব্যবসায় আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানগুলোর অনীহার কারণ কি?
আকতার হোসেন সান্নামাত: লিজিং ব্যবসার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সম্পদের স্বত্ত্বাধিকার গ্রহণ করে সেটাকে লাভজনক খাতে কাজে লাগানো। আর সম্পদের অবচয় আছে। আগে এ সম্পদের ওপর আর্থিক প্র্রতিষ্ঠান অবচয় ধার্য করতো প্রারত। ফলে এখান থেকে ট্যাক্স অব্যাহতি পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে আইএএস-১৭ অনুযায়ী সম্পত্তির ওপর অবচয় ধার্য করা যায় না। পরিণতিতে ট্যাক্স অব্যাহতির বিষয়টিও বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে লিজিং ব্যবসায় ঝুঁকি খুব বেড়ে গেছে। তাই এ ব্যবসাকে বাঁচাতে অন্য দেশগুলোতে এমনকি ভারত পাকিস্থানের সরকার আলাদা এসআরও করে এ খাতে ট্যাক্স অব্যাহতির ব্যবস্থা করেছে। অথচ আমরা এনবিআর-কে এ বিষয়ে অনেকবার ব্যবস্থা নেয়ার কথা অনেকবার বললেও তারা আমাদের কথা আমলে নেয়নি।

শেয়ারবাজারনিউজ: এ খাতে মুনাফা ক্রমান্বয়ে কমছে। এর কারণ কি বলে আপনি মনে করছেন?
আকতার হোসেন সান্নামাত: বর্তমানে ফাইন্যান্সিয়াল খাতে প্র্রচুর পে-অফ হচ্ছে। যা এ ব্যবসার জন্য বিরাট হুমকি। অথচ নতুন ফাইন্যান্সিং একেবারেই তলানিতে ঠেকেছে। তাই ফান্ড খরচ বাড়ছে কিন্তু ব্যবসা বাড়ছে না। পরিনতিতে কোম্পানিগুলো ভাল মুনাফা করতে প্রারছে না।
শেয়ারবাজারনিউজ: কিন্তু দায়িত্বশীলদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। এর সুফল কি আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানের গায়ে লাগছে না?
আকতার হোসেন সান্নামাত: বিনিয়োগ প্র্রবৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন প্র্রতিষ্ঠান থেকে যেসব তথ্য দেয়া হচ্ছে এসব তথ্যে বড় ধরণের শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। কারণ বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রাহক ঋণ নিয়ে অন্য প্র্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ করছে। তাহলে কি এই অর্থায়ন সত্যিকার বিনিয়োগে ব্যবহার হচ্ছে? আর এ কারণে নীট বা গ্রস বিনিয়োগ বাড়ছে না। আর আমাদের দেয়া তথ্যগুলোতে শুধুমাত্র বিনিয়োগ কত হয়েছে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু এর আগে কতগুলো অর্থায়ন পে-অফ হয়েছে সেটা প্র্রকাশ করা হচ্ছে না। তাই প্র্রকৃত চিত্র সামনে আসছে না।

শেয়ারবাজারনিউজ: মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজগুলোর মুনাফায় এতো ধস নামার কারণ কি? বিশেষ করে যারা সাবসিডিয়ারি হিসেবে রয়েছে?
আকতার হোসেন সান্নামাত: বিষয়টি আসলে নির্ভর করেছে কোম্পানি ভেদে বিভিন্ন স্ট্রাটেজি নেয়ার কারণে। অনেকেই মার্জিন লোন দেয়ার ক্ষেত্রে বাছ-বিচার করেনি। বরং কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে। যার জন্য সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু ব্রোকারেজ হাউজের জরিমানাও হয়েছে। এখানে মার্জিন হিসেবে গ্রাহককে যে টাকাটা দেয়া হলো, এ টাকা কোথা থেকে এসেছে? নিশ্চয় সে ঋণ করেছে। অর্থাৎ তার মাথার ওপর একটা বড় দায় রয়েছে। আর সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তো সে খেলাপি হয়ে যাবে। এইসব কারণে কোম্পানিগুলোকে অসময়েও অর্থাৎ নিম্নমুখী প্রবনতার মধ্যেও শেয়ার বিক্রি করতে হয়েছে।

শেয়ারবাজারনিউজ: এর থেকে পরিত্রাণ প্রাওয়ার ওপায় কি?
আকতার হোসেন সান্নামাত: এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে ধৈর্য ধরতে হবে। ক্লায়েন্টের সার্থে স্বচ্ছ বোঝাপোড়া গড়ে তুলতে হবে। যাতে ক্লায়েন্ট তার হাউজে নিশ্চিন্তভাবে বিনিয়োগ করতে পারে। আর এ স্ট্রাটেজি অনেক হাউজের মুনাফায় কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

শেয়ারবাজারনিউজ: বাজারে দেখা যায় একটা কোম্পানি প্র্রথমদিকে কিছু বছর বেশ লাভজনক অবস্থায় থাকছে। কিন্তু পরবর্তীতে কোম্পানিটি লোকসানের পাল্লা ভারি হতে থাকে। এমনকি কোম্পানিটি এ লোকসান কিছুকেই কাটিয়ে উঠতে পারে না। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?
আকতার হোসেন সান্নামাত: একটা কোম্পানিকে ভাল অবস্থায় অর্থাৎ মুনাফায় রাখতে হলে অনেকগুলো বিষয় নিয়ে স্বচ্ছতার সাথে কাজ করতে হয়। কোরামিন দিয়ে কোন কিছু বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। আর আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিকার অর্থে অনেক চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এসব চ্যালেঞ্জ দূর করা অনেক দু:সাধ্য ব্যাপার।
শেয়ারবাজারনিউজ: কোম্পানির মুনাফা বাড়াতে হলে কি করা উচিত?
আকতার হোসেন সান্নামাত: ব্যবসায় কোম্পানিকে ভাল করতে হলে তা গুড গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে গুড গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে হলে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের স্বতন্ত্র পরিচালকের দায়িত্বটিকে পুরোপুরি স্বাধীন করতে হবে। আর এখন কি হচ্ছে? স্বতন্ত্র পরিচালক কি তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারছে? কারণ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা তো তার নেই। বোর্ডে তো তার কথা বলার জায়গাই নেই। বোর্ড তাকে নিয়োগ দিয়েছে সুতরাং সে চাইলেও বোর্ডের বিরুদ্ধে কথা বলতে প্রারবে না। তাই এখানে আমার কিছু উপদেশ রয়েছে। এ স্বতন্ত্র পরিচালক যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থাদের কাছ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হয় তবে তবে বোর্ডে সে একটা ভাল দায়িত্ব পালন করতে পারে। আর এ জায়গায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকই (বিএসইসি) বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন দেশের কোম্পানি ও অ্যাকাউন্টস সম্পর্কে দক্ষ ও প্র্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের নিয়ে তারা একটা পুল গঠন করতে পারে। এ পুল থেকে বিভিন্ন কোম্পানিতে ইনডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এতে কোম্পানির বোর্ডে বিএসইসি’র নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। পাশাপাশি অনিয়মের পরিমাণও কমবে। ফলে কোম্পানিতে গুড গভর্ন্যান্স প্র্রতিষ্ঠিত হবে।

শেয়ারবাজারনিউজ: আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধনের নূণ্যতম লক্ষমাত্রা বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর যৌক্তিকতা আপনি কিভাবে দেখছেন?
আকতার হোসেন সান্নামাত: পৃথিবীর কোথাও এমন নজির নেই যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিশোধিত মূলধন অর্জনের নূণ্যতম লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ কাজটিই করেছে। অথচ বাসেল টু-তে বলা হয়েছে দায়ের বিপরীতে ১০ শতাংশ ক্যাপিটাল থাকতে হবে। এখানে ক্যাপিটাল মানে পরিশোধিত মূলধন নয়। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানগুলোকে ইক্যুইটি কিংবা রিজার্ভ বাড়াতে বলতে পারে। আর এ বিষয়টি আমরা অনেক বার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বোঝানোর চেষ্টাও করেছি।

শেয়ারবাজারনিউজ: ব্যাংক ও আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট কর হার সমান। অথচ তাদের ব্যবসা সমান নয়। একে বৈষম্য বলবেন কি?
আকতার হোসেন সান্নামাত: সরকারের কর নীতিতেও আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। যেমন বর্তমানে ব্যাংকে বার্ষিক ৪০ শতাংশ কর্পোরেট কর দিতে হয়, আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানকেও একই হারে কর দিতে হয়। অথচ আর্থিক প্র্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকের আয়ের সীমা এবং সুযোগ অনেক বেশি।

শেয়ারবাজারনিউজ: আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানের চলমান অচলাবস্থার পেছনে আপনি কোন বিষয়টিকে দায়ী করবেন?
আকতার হোসেন সান্নামাত: আর্থিক খাতে ভাল লিডার তৈরি হচ্ছে না। যা এ খাতটির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর ভাল লিডার না থাকায় এ খাতটি ক্রমেই অবহেলার দিকে যাচ্ছে। তাছাড়া এখন মানুষের মধ্যে জানার আগ্রহ কম। এর পাশাপাশি সততার ব্যাপক অভাব রয়েছে। আর এসব কারণে ভাল লিডার তৈরি হচ্ছে না। ইতিহাসে দেখা গিয়েছে যে কোন সেক্টরের উন্নয়ন ঘটেছে কোন না কোন নেতৃত্ব প্র্রদানকারীর গুণে। আজ আর্থিক প্র্রতিষ্ঠানের সুদিন ফেরাতে তাদের হয়ে কথা বলার লোক কোথায়?
শেয়ারবাজানিউজ/তু/ও/মু

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top