চীনের শেয়ারবাজার নিয়ে সিএসইর বিশ্লেষণ

cse internationalশেয়ারবাজার রিপোর্ট: সপ্তাহান্ত কাটিয়ে প্রথম কর্মদিবস সোমবারে চীনের সাংহাই কম্পোজিট ইনডেক্স হঠাৎ করেই পড়ে যায় সাড়ে আট শতাংশ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতে বিনিয়োগকারীদের সাড়ে সাত লাখ কোটি রুপি গায়েব হয়ে যায়। ধাক্কা লাগে যুক্তরাষ্ট্রেও।

‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর’ ইনডেক্স নেমে যায় আড়াই শতাংশ। এছাড়া জাপান, তাইওয়ান সহ বিশ্বের প্রায় সবকটি গুরুত্বপূর্ণ শেয়ারবাজারে সূচকের পতন ঘটে বিপুল হারে। বলা যায় সূচকের লাগামহীন পতনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে টালমাটাল হয়ে ওঠে সারা বিশ্বের শেয়ারবাজার।

প্রশ্ন উঠেছে হঠাৎ এই অস্থিরতার মূলে কী? কেন এই সূচকের পতন? অর্থনীতিবিদ ও বাজার সংশ্লিষ্টরা এখন ব্যস্ত তারই উত্তর খুঁজতে।

সঙ্কটের উৎপত্তি চীনে। চীনের শেয়ারবাজারে অস্থিরতার পদধ্বনি পাওয়া যায় গত সপ্তাহেই। তবে বিষয়টি তেল ব্যবসায়ী, চীনা আমলা ও হেজ ফান্ড ম্যানেজারদের মাথা ব্যথার বিষয় বলে একে পাত্তা দিতে চায়নি অনেকেই।

এ পরিস্থিতিতে হঠাৎ সোমবার সাড়ে আট শতাংশ পড়ে যায় সাংহাই কম্পোজিট ইনডেক্সের সূচক। যার ধাক্কায় কেঁপে ওঠে বিশ্বের প্রায় সবগুলো বাজার।

সোমবার এক ভারতেই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিনিয়োগকারীদের পকেট থেকে লোপাট হয়ে যায় সাড়ে সাত লাখ কোটি রুপি। সেনসেক্স সূচকের পতন ঘটে ৬.২২ শতাংশ। বাঁচতে পারেনি মার্কিন মুলুকও। সেখানকার ‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর’ ইনডেক্স সোমবার সকালে নেমে যায় আড়াই শতাংশ।

কেন এই আকস্মিক পতন?
পুরো বিষয়টিই আসলে বৈশ্বিক পটভূমির একটি গল্প। যার শুরু ব্যস্ত সাংহাই নগরীর অলিগলিতে। মধ্যপ্রাচ্য এবং আমেরিকার তেলের খনি থেকে এই গল্পের ডালপালা বিস্তৃত ওয়াশিংটনের ফেডারেল রিজার্ভ (কেন্দ্রীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা) ভবনের বারান্দা পর্যন্ত।

চীন দিয়েই শুরু করা যাক। ইদানীং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হয়ে উঠেছে চীনের বিপুল সংখ্যক উঠতি মধ্যবিত্তের এক নতুন খেলা। বেশ কয়েক বছর ধরেই চীনের অর্থ বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে এই উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিনিয়োগে। পাশাপাশি ঝটিকা লাভের আশায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চীনের শেয়ারবাজারে বিপুল পরিমাণ ‘হট মানি’র আমদানি সেই চাঙ্গাভাবে যোগায় নতুন হাওয়া।

কম সময়ে অধিক মুনাফার আশায় শেয়ারবাজারে অর্থ বিনিয়োগকেই লাভজনক পন্থা হিসেবে ধরে নেন চীনের মধ্যবিত্ত শ্রেণী। কিন্তু গত কয়েক মাস আগে থেকেই সেই প্রবণতায় মন্দাভাব দেখা দেয়। একই সময়ে শ্লথ হয়ে পড়ে চীনের অর্থনীতির গতি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফটকা বাজারিরা চীনের শেয়ারবাজার থেকে লাভসহ তুলে নিতে থাকে তাদের বিনিয়োগ করা ‘হটমানি’।

এ পরিস্থিতির গুরুত্ব অবশ্য আগেই উপলব্ধি করতে পারে চীনা কর্তৃপক্ষ।পুরো গ্রীষ্ম জুড়েই বাজারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ছিলো সরকারি প্রচেষ্টা। কিন্তু বেইজিংয়ের ব্যাপক কসরত সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ঠেকানো যায়নি পতন। গত জুন থেকে এ পর্যন্ত সাংহাই কম্পোজিট ইনডেক্স পড়ে গেছে ৩৮ শতাংশ।

চীনের অর্থনীতির গতি শ্লথ হওয়ার পেছনে অবশ্য বিশ্লেষকরা দায়ী করছেন বেইজিংয়ের বর্তমান সরকারের বেশ কিছু অর্থনৈতিক নীতিকে। এতদিনকার অনুসরিত বেশি বিনিয়োগ ও বেশি রফতানির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল এবং টেকসই করার নীতি নিয়েছে বেইজিং। এই পা পেছলানোর পেছনে চীন সরকারের সেই নীতিকেও দায়ী মনে করছেন অনেকেই।

চীন থেকে শুরু হলেও এই সঙ্কটের আকার ও ব্যাপ্তি এখন চীনের প্রাচীরের থেকেও বড়। তবে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে একই সঙ্গে মাতাল হাওয়া বওয়ার জন্য শুধু চীনের অর্থনৈতিক সঙ্কটকে সামনে আনা হলে সে ব্যাখ্যা হবে অসম্পূর্ণ।

এর পেছনে রয়েছে আরও অন্তর্নিহিত কিছু কারণ। এর ফলেই চীনা টাইফুনের মাতাল হাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির সমুদ্রে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় ঢেউয়ের। গত কয়েক মাস ধরেই নিজেদের শেয়ার বাজারের ধস ঠেকানোর জন্য হস্তক্ষেপ করছিলো চীনা সরকার। কিন্তু তারপরও অর্থনীতির সহজ অবতরণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় বেইজিং। এই বিষয়টিই ভীতির সৃষ্টি করে সারা বিশ্বের শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

‘যেখানে চীনের প্রবল পরাক্রমশালী সরকারের সব প্রচেষ্টা বাজারের ধস ঠেকাতে ব্যর্থ, তখন অন্যান্য বাজারের ভবিষ্যত কী?’ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে তাড়াহুড়ো করে হাতে থাকা শেয়ার ছেড়ে দিতে শুরু করেন তারা। অস্থিরতার এই ধাক্কা নিমিষে প্রবাহিত হয় মালয়েশিয়া থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব উদীয়মান অর্থনীতির বাজারে।

তবে এই ধসের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃপক্ষের বেশ কিছু নীতিকেও দায়ী করা হচ্ছে। সোমবারের এই ঘটনাকে তৃতীয় টেপার টেনট্রাম (ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃপক্ষের প্রনীত নীতির কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা)হিসেবে বিবেচনা করছে কোনো কোনো মহল।

প্রথম ‘টেপার টেনট্রাম’ হয়েছিলো ২০১৩ সালের জুন মাসে। ওই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি সারা বিশ্বের অর্থবাজারগুলো এক সাথে অস্থির হয়ে পড়েছিলো। সত্যিই সত্যিই মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ বাজারে অর্থ প্রবাহ বন্ধ করতে যাচ্ছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ায় সৃষ্টি হয় এই অস্থিরতা।

এর আগে ২০০৬ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা শুরুর সময় থেকেই বাজারের স্বাস্থ্য ধরে রাখতে নিয়মিতভাবে সেখানে অর্থের প্রবাহ বজায় রাখতো ফেডারেল রিজার্ভ। একই রকমের দ্বিতীয় ধাক্কা আসে ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে। যখন বাজারে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ‘ফেডারেল রিজার্ভ ২০১৫ সালেই সুদের হার বাড়াতে যাচ্ছে’।

এরই প্রতিক্রিয়ায় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা মার্কিন শেয়ার বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে উচ্চ লাভের আশায় দ্রুতবর্ধনশীল উদীয়মান বাজারগুলোতে বিনিয়োগ শুরু করে। ফলে এসব দেশের অর্থবাজারে ঢোকে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ। শেয়ারের দাম বাড়ে হু হু করে।

কিন্তু যখন এই প্রবাহ থেমে যায় এবং দ্রুত বিনিয়োগকৃত এসব অর্থ অর্থনীতির ভাষায় যাকে অভিহিত করা হয় ‘হট মানি’, বাজার থেকে সরিয়ে নেয়া হয়, তখন বেড়ে যায় সুদের হার। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। সঙ্কটে পড়ে সেসব দেশের অর্থনীতি।

এছাড়া তেলের দামের অব্যাহত পতনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই সঙ্কটের পিছনে। গত জুনেও তেলের দাম ছিলো ব্যারেল প্রতি ৬০ ডলার। অথচ এখন তা নেমে এসেছে ৪০ ডলারে। বিষয়টি পশ্চিমা তেলের ভোক্তাদের জন্য সুখবর হলেও অর্থ বাজারগুলোতে সৃষ্টি করে আশঙ্কার।

গত বছরের শেষের দিকে যখন তেলের দাম পড়া শুরু করে, তখন সবাই ভেবেছিলো বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার জন্য উৎপাদকরা তেলের উৎপাদন কমিয়ে দেবেন। কিন্তু দেখা গেলো ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলাকে জব্দ করতে দাম কমে যাওয়া সত্ত্বেও মার্কিন কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন বজায় রেখেছে, তাদের সাথে তাল মেলাচ্ছে সৌদি আরব সহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো।

অপরদিকে এসব তেলের মূল ভোক্তা চীনসহ এবং অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়ায় একই সঙ্গে চাহিদা যায় কমে। ফলে বাজারে উচ্চ সরবরাহ এবং দুর্বল চাহিদা ত্বরান্বিত করে তেলের মূল্য পতন।

এতে শুধু জ্বালানি রফতানির ওপর নির্ভরশীল দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয় যখন একই সময় মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ তাদের সুদের হার বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এ সিদ্ধান্তের পেছনে কেন্দ্রীয় রিজার্ভের কর্মকর্তাদের যুক্তি হলো, মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সঠিক পথেই আছে। তাই সুদের হার বাড়ানোর এটাই উপযুক্ত সময়। আসলে মার্কিন অর্থনীতির সঙ্কট কাটাতে গত সাত বছর ধরেই সেখানে সুদের হার বজায় ছিলো শূন্য শতাংশের কাছাকাছি।

জানা গেছে, আগামী ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বরের নীতি নির্ধারণী বৈঠকেই সুদের হার বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে ফেডারেল রিজার্ভ।

সমালোচকরা অবশ্য ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃপক্ষের সুদের হার বাড়ানোর এই তৎপরতার সমালোচনা করেছে। জবাবে ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সিদ্ধান্ত নেয় অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য সূচক যেমন মুদ্রাস্ফীতির হার ও বেকারত্বের হার পর্যালোচনা করে। তাদের মতে এখন পর্যন্ত মার্কিন মুদ্রাস্ফীতির হার এবং বেকারত্বের হার স্থিতিশীল রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে যদি আসন্ন ওই বৈঠকের সময় পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য এই অর্থনৈতিক সূচকগুলো স্থির থাকে, সেক্ষেত্রে বাজারের সূচক অস্থির হয়ে পড়লেও তাদের পক্ষে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব হবে না।

তবে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা সেপ্টেম্বরে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজারের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে বিবেচনা করবে ফেডারেল রিজার্ভ। পাশাপাশি তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, শেয়ারবাজারের এই অস্থিরতা মার্কিন প্রবৃদ্ধিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সব মিলিয়ে গত কয়েকদিনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এটাই বোঝা যাচ্ছে যে এবারের অর্থনৈতিক সঙ্কটের গতি প্রকৃতি একটু জটিল।

অনেকগুলো বৈশ্বিক ও কূটনৈতিক সমীকরণে আটকে আছে এই সঙ্কট উত্তরণের অঙ্ক। শুধু মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ বা চীনা সরকারের প্রচেষ্টাই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার জন্য পর্যাপ্ত নয়।

>চীনের শ্লথগতি কি আমাদের দরিদ্র করে দেবে?
চীনের অর্থনীতির মতো আর কোনো গল্প এ বিশ্বে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ৩০ বছর ধরে দেশটির জাতীয় আয় বার্ষিক ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা দরিদ্রতা থেকে মুক্তি দিয়েছে দেশটির লাখো মানুষকে। শুধু তা-ই নয়, বর্তমানে দেশটি দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে বিশ্বে জায়গা করে নিয়েছে।

বিশ্বের জিডিপিতে ১৫ শতাংশ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ২৫ শতাংশ অবদান এখন চীনের। এ অবস্থায় যদি বলা হয়, ১৯৭৮ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনীতির গল্প আসলে চীনেরই, তাহলে অতিরঞ্জিত কিছু বলা হবে না। কারণ সুদের হার থেকে শুরু করে জ্বালানি বা কাঁচামালের দামের ওঠানামা প্রায় সবকিছুই এ দেশটির ওপর নির্ভর করত। ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে দেশটির যে প্রতাপ, তা প্রায় সবক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখত।

বর্তমানেও দেশটির আর্থিক বাজারে যা ঘটে যাচ্ছে, তা আমাদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না এ কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এ বাজারগুলো বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। বর্তমানে সবচেয়ে সতর্ক থাকার ইস্যু হচ্ছে সাংহাই স্টক মার্কেট। এ শেয়ারবাজারের বেশির ভাগ শেয়ারই তাদের সর্বোচ্চ দৈনিক দরপতন সীমা ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যার প্রভাবে বিশ্বের সব জায়গায়ই বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ছন্দপতন ঘটিয়েছে ও শেয়ার দরে পতন হয়েছে। ইউরোপে গড়ে ৫ শতাংশ দরপতন হয়েছে। এর চেয়ে কিছুটা কম দরপতন হয়েছে উত্তর আমেরিকায়।

এ অবস্থায় অনেক দিন ধরেই যে প্রত্যাশা করা হচ্ছিল, চীনের অর্থনীতি এ যাবতকালের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে প্রসারিত হতে যাচ্ছে, তার এবার সমাপ্তি হলো। কয়েক বছর ধরেই ঋণ চালিত বিনিয়োগে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল দেশটি। চীন এখন এ ধারা থেকে বেরিয়ে ভোক্তানির্ভর অর্থনীতিতে মনোযোগী হতে চাইছে। কিন্তু তেলের সঙ্গে কমোডিটি পণ্যের দরপতন সামগ্রিক পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে ফেলেছে। বিভিন্ন দেশের বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রাগুলোও ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির ইস্যুকৃত বন্ডগুলোই সুসময়ের মধ্যে রয়েছে। এমনকি বিনিয়োগের নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত স্বর্ণের দামও কিন্তু এখন নিম্নমুখী।

এ সময়টিকে আমরা নিজেদের ক্রয় সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে উদযাপন করতে পারি। সেসঙ্গে সস্তা ঋণ পাওয়ার সুবাদে বিষয়টি আরো সহজ হয়ে উঠেছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) ও যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে পারে, ফলে গ্রাহকরা আরো কম সুদে ঋণ নিতে পারবে এবং পণ্যের দরপতনের এ সময়ে জমিয়ে কেনাকাটা করতে পারবে। মূলত চীনের প্রভাব বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে যাওয়া ও মূল্য সংকোচনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কায়ই সুদের হার বৃদ্ধিতে বিলম্ব করছে দেশগুলো। বিদ্যমান পরিস্থিতি ক্রেতাদের অনুকূলে। কিন্তু এটি কত দিন এ অবস্থায় থাকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

কিন্তু একটি বিষয়ে আমাদের একদম পরিষ্কার থাকতে হবে; তা হচ্ছে যদি চীনের পরিস্থিতি জাপানের মতো হয়ে যায় অর্থাত্ কয়েক বছর ধরে যদি দেশটিকে স্বল্প প্রবৃদ্ধি এমনকি স্থবিরাবস্থার মধ্যে থাকতে হয়, তাহলে আমাদের বড় মূল্য পরিশোধ করতে হবে। যুক্তরাজ্যের জন্য এটি বিশেষভাবে সত্যি প্রমাণিত হবে। দেশটির অভ্যন্তরীণ ব্যয় ও ব্যবসার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। নিজেদের জীবনধারণের খরচ মেটাতে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নেয়া হলে একসময় চলতি হিসাবে ঘাটতির পাল্লাটিও ভারী হয়ে উঠবে। পাশাপাশি পুরো বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নেতিবাচক ভারসাম্য সৃষ্টি হবে। এ অবস্থায় ক্রেতারা যদি কেনাকাটা কমিয়ে দেয়, তাহলে দেশটি তার চরম খেসারত দিতে হবে।

আর চীনের শ্লথগতি যদি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে স্থায়ী শ্লথগতির সৃষ্টি করে, তাহলে এটি আমাদের ক্রয় সক্ষমতায়ও ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে আমরা বাধ্য হয়ে ব্যয় কমিয়ে দেব। যাকে এক অর্থে দরিদ্রতাও বলা যায়।

>উদীয়মান বাজারের মুদ্রা ঝুঁকি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ঘাড়ে
অধিক মুনাফা আর বাড়তে থাকা বিনিময় হারের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উদীয়মান বাজারগুলোয় স্থানীয় মুদ্রায় ছাড়া বন্ডে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু উদীয়মান অর্থনীতির শ্লথগতি, স্থানীয় মুদ্রার মান পতন ও ডলারের মান বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন এসব বিনিয়োগকারী।

উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মুদ্রার মান কমায় বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বন্ড থেকে আয় ক্রমাগত কমছে। অন্যদিকে বন্ডের ক্রমাগত মূল্য পতন বিনিয়োগকারীদের লোকসান আরো বাড়াচ্ছে। এরই মধ্যে অর্থনৈতিক শ্লথগতি ও ভোগ্যপণ্যের কম দামে দুশ্চিন্তায় থাকা বিনিয়োগকারীদের চিন্তা আরো বাড়ছে।

ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী উদীয়মান অর্থনীতির বন্ড বাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান মর্নিংস্টার ইনকরপোরেটেড বলছে, উদীয়মান বাজারের স্থানীয় বন্ড ফান্ড থেকে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে অর্থের বহিঃপ্রবাহ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে।

চলতি বছর এ পর্যন্ত ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পিমকো ইমার্জিং লোকাল বন্ড ফান্ডের মান কমেছে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ, ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের গোল্ডম্যান স্যাকস লোকাল ইমার্জিং মার্কেটস ফান্ডের মান কমেছে ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ, ২৩৪ মিলিয়ন ডলারের টিসিডব্লিউ ইমার্জিং মার্কেটস লোকাল কারেন্সি ফান্ডের মান কমেছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণত বিদেশী বিনিয়োগকারীদের হাতে স্থানীয় মুদ্রায় ছাড়া বন্ডের বেশির ভাগ অংশ থাকলে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা বেশি, কারণ সংকটের সময় তারা চলে যেতে পারেন। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামা প্রতিষ্ঠানের হাতে এ ধরনের বন্ড থাকা উচিত। সংকটের সময় এদের পিছু হটার সম্ভাবনা কম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উদীয়মান অর্থনীতিতে বিশেষ করে চীনের প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি বলছে, উদীয়মান দেশগুলোর মুদ্রার মান আরো কমতে পারে।

>বিশেষজ্ঞ মতঃ বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বাড়তে পারে আরো অনিশ্চয়তা
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিশ্বের শেয়ারবাজারে ধসের পর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। ভবিষ্যতে এ অনিশ্চয়তা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

গত সোমবার চীনের শেয়ারবাজারে আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দরপতন হয়। সাংহাই কম্পোজিট সূচক ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ২০৯ পয়েন্টে। নিউইয়র্কের ডাও জোনস সূচক ৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ অথবা ৫৮৮ পয়েন্ট হারিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৮৭১ পয়েন্টে। দিনের শুরুতেই সেখানে ১ হাজার পয়েন্টের বেশি হ্রাস পেয়েছে।

এসঅ্যান্ডপির সূচক ৭৭ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৯৩ পয়েন্টে। অন্যদিকে নাসডাক কম্পোজিট সূচক ১৭৯ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট কমে পৌঁছায় ৪ হাজার ৫২৬-এ।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফান্ডস্ট্র্যাটের ব্যবস্থাপনা সহযোগী থমাস লি বলেন, ‘বর্তমানে প্রচণ্ড আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।’ তিনি জানান, সার্বক্ষণিকভাবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখছেন তারা। চীনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির সময়, তেলের মূল্যে নিম্নগতি প্রভৃতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নির্ধারক বিষয়গুলোর ওপর নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্টক ধরে রাখা তাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মরগান স্ট্যানলি এশিয়ার সাবেক চেয়ারম্যান ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন রোচ বলেন, ‘ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) প্রত্যাশিত সহায়তা পায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার। তবে ফেডের এ সহায়তা আসলে কৃত্রিম। এতে দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আসে না। অর্থনীতির মৌলিক পরিবর্তনের জন্য নতুন ও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।’

শেয়ারবাজার চাঙ্গা করতে ফেডের বিভিন্ন পদক্ষেপ বর্তমানে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইকুইটি বাজার এখনো শক্তিশালী আবাসন বাজার ও জ্বালানির নিম্নমূল্যের প্রভাবে সহায়তা পাচ্ছে।

লি বলেন, চীনের অর্থনীতি নিয়ে বাজারগুলো উদ্বিগ্ন। তবে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কার তুলনায় ভালো অবস্থানেই রয়েছে দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ জানিয়ে ক্রেনশেয়ারের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক ব্রেন্ডেন আহেরন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ভালো প্রবৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে যেগুলো তাদের খুঁজে নিতে হবে।

>১ সপ্তাহে পুঁজিবাজারে শীর্ষ ধনীদের ১৮২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি
শেয়ারবাজার ধসের কারণে বিশ্বের শীর্ষ ৪০০ ধনী ব্যক্তি এক সপ্তাহের মধ্যে ১৮২ বিলিয়ন ডলার সম্পদ হারিয়েছেন। তবে শীর্ষ ধনীদের মোট সম্পদের পরিমাণ হচ্ছে ৩ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্ববাজার ও অর্থনীতির পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে ব্লুমবার্গ বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করে।

এতে দেখা গেছে—ব্লুমবার্গ বিলনিয়ার সূচকের বড় ধরনের পতন হয়েছে গত সপ্তাহে। ২০১১ সালের পর গত শুক্রবার আমেরিকার শেয়ারবাজারের স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস সূচক-৫০০ এর সর্বোচ্চ পতন ঘটে। এতে একদিনেই শীর্ষ ধনী ব্যক্তিরা সম্পদ হারিয়েছেন ৭৬ বিলিয়ন ডলার।

ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিভিন্ন খাতের কোম্পানির শেয়ারের দর কমে যাওয়ায় বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা তাদের সম্পদ হারিয়েছেন। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য উত্পাদন করে না এমন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগে সবচেয়ে বেশি সম্পদ হারিয়েছেন তারা। এ ধরনের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ সম্পদ বা ৫৯ বিলিয়ন ডলার লোকসান গুনছেন তারা।

এ ছাড়া, প্রযুক্তি ও কারিগরি পণ্য উত্পাদনকারী খাতে বিনিয়োগে ৩৭ বিলিয়ন, যোগাযোগ খাতে ১৯ বিলিয়ন এবং জ্বালানি খাতে ১৬ বিলিয়ন।

এ দিকে, তেলের দর কমে যাওয়ায় গত সপ্তাহে জ্বালানি খাতের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিরা ১৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সম্পদ হারিয়েছেন।

অপর দিকে, চীনের ২৬ জন শীর্ষ ধনী ব্যক্তি গত সপ্তাহে ১৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার লোকসান গুনেছেন। হংকং শেয়ারবাজারে পতন ও চীনের মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে তারা এ লোকসান গুনেছেন।

 

সূত্র: সিএসইর ফেসবুক পেইজ

 

শেয়ারবাজারনিউজ/ম.সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top