আবারো ইউনাইটেডের অর্থ লোপাটের পায়তারা!

united airশেয়ারবাজার রিপোর্ট : এবার প্রবাসীদের থেকে অর্থ লোপাটের পায়তারা শুরু করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত কোম্পানিটি হঠাৎ করেই ব্যবসা বাড়ানোর নামে প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করার আহ্ববান জানায়।

লন্ডনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কোম্পানির বিতর্কিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসবিরুল চৌধুরী এ আহ্ববান জানান। কিন্তু কোম্পানির জনসংযোগ বিভাগের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা ব্যপারটি পুরোপুরি অস্বীকার করেন।

সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের নতুন গন্তব্য থেকে বাংলাদেশে, এমনকি সিলেটেও সরাসরি ফ্লাইট চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়টি জানানো হয়। এ লক্ষ্যে বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসার পরিধি বাড়াতে প্রবাসীদের বিনিয়োগ করার জন্য আহ্ববান জানিয়েছে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচারক তাসবিরুল চৌধুরী।

এসময় তাসবিরুল আরও বলেন, বোয়িং ও এয়ারবাসের মতো বিলাসবহুল এবং অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ যুক্ত করার মাধ্যমে কোম্পানির বহরের আকার দ্বিগুণ করতে ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। নতুন উড়োজাহাজ দিয়ে লন্ডনের গ্যাটউইক, বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টার থেকে সিলেট ও ঢাকায় সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা কোম্পানির রয়েছে।

এদিকে কোম্পানির ব্যবসায়িক অবস্থান বোঝাতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রায় সব রুট ছাড়াও বর্তমানে ঢাকা থেকে কলকাতা, দুবাই, কাঠমান্ডু, জেদ্দা, কুয়ালালামপুর, মাস্কট, সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককে ইউনাইটেডের উড়োজাহাজ চলছে বলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন। ‘ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডে’ বিনিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য কিংবা অন্যান্য দেশে বসবাসরত প্রবাসীরা কোম্পানির অংশীদার হতে পারবেন বলে জানান তাসবিরুল চৌধুরী। পাশাপাশি এ ফান্ডে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীদের ভিআইপি মর্যাদা দেয়া হবে এমন লোভ দেখান তিনি। কিন্তু এমন কোনো ধরনের ফান্ডের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে কোম্পানিটির ওয়েবসাইট, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ(ডিএসই) এবং চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জ(সিএসই) এর ওয়েবসাইটেও ফান্ড সম্পর্কিত কোন ঘোষণঅ কিংবা তথ্য নেই।

এর আগে, ২০১০ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ প্রাথমিক গণপ্রস্তাবেই (আইপিও) বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে। এর পরের বছরই কোম্পানিটি রাইট ইস্যুর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আরও ৩১৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে। ৬২৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিটির ৭১.৯৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৪৪৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের।

বারবার বাজার থেকে টাকা উত্তোলন করলেও কোম্পানির সুদিন ফিরেনি। আইপিও’র আগের বছর ২০০৮ এ প্রায় ৪ কোটি টাকা লোকসানে থাকা কোম্পানিটি পরের বছরই লোকসান কাটিয়ে প্রায় ৪ কোটি টাকা মুনাফা দেখায়। বিশ্লেষকদের মতে, লোকসানি কোম্পানিটি আইপিও’র অনুমোদন পাওয়ার জন্য ২০০৯ সালে কারসাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমানের মুনাফা দেখায়।

এর আগেও নতুন উড়োজাহাজ কেনার জন্য এবং নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট চালু করবে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়্। কিন্তু এসব স্ব-ঘোষণা বাস্তবে রুপ পায়নি। পরিনতিতে যাত্রীসেবার বদলে ট্রানজিট যাত্রী দিয়েই ধুঁকে ধুঁকে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কোম্পানিটি। এমনকি যাত্রীসেবার মান নিয়েও একাধিকবার যাত্রীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়।

এদিকে হরতাল-অবরোধের মধ্যে অন্য এয়ারলাইনসগুলো আকাশপথে ভালো ব্যবসা করলেও তা পারছে না ইউনাইটেড এয়ার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনার অভাব ও আর্থিক সংকটই এয়ারলাইনসটির এ দুরবস্থার জন্য দায়ী। এর ওপর রয়েছে পরিচালনা পর্ষদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। গত বছরের সেপ্টেম্বরেই কোম্পানির পরিচালনা পর্যদ থেকে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করার পর অর্থের অভাবে সব ধরনের ফ্লাইট বন্ধ ঘোষনা করে ইউনাইটেড এয়ার।

এর মধ্যেই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত শুরু হয়। তাসবিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, আন্তর্জাতিক দরের তুলনায় বেশি মূল্যে উড়োজাহাজ ক্রয়ের মাধ্যমে তিনি বিদেশে অর্থ পাচার করেন। এম.ডি’র দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তিনি ২০ বছরের পুরোনো উড়োজাহাজ কিনেছেন আন্তর্জাতিক দরের তুলনায় অনেক বেশি দামে। এসব উড়োজাহাজ কেনার নামেই পুঁজিবাজার থেকে রাইট শেয়ার ইস্যুর নামে ৩১৫ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়।

 

নিয়মানুসারে, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং উড়োজাহাজ কিনতে হবে প্রতিযোগিতামূলকভাবে প্রাপ্ত সর্বনিম্ন দরদাতার কাছ থেকে। কিন্তু এ নিয়ম ভেঙ্গে এমনকি একই মডেলের উড়োজাহাজ একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দামে কিনেছে কোম্পানিটি। সেসময়, এমডি-৮৩ মডেলের উড়োজাহাজ একই সময়ে ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার, ৭৬ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার ও ৮৮ লাখ ২৪ হাজার ৫৮০ মার্কিন ডলারে কিনে বিপুল পরিমান অর্থ পাচার করা হয় বলে দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগে উঠে আসে। অন্য তিনটি মডেলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে।

 

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের বহরে বর্তমানে ১১টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ৯টিই উড্ডয়ন অনুপযোগী। অবশিষ্ট দুটি উড়োজাহাজ দিয়েই কোনো রকমে ফ্লাইট চালু রেখেছে বেসরকারি খাতের এয়ারলাইনস কোম্পানিটি। অথচ সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য অভ্যন্তরীণ রুটসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্লাইট চালু রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

 

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের বহরে থাকা উড়োজাহাজের মধ্যে পাঁচটি এমডি-৮৩। এছাড়া, দুটি এয়ারবাস-এ৩১০-৩২৫ রয়েছে, এটিআর৭২-২১২ তিনটি ও ড্যাশ-৮-১০০ উড়োজাহাজ রয়েছে একটি। এর মধ্যে একটি এয়ারবাস-এ৩১০-৩২৫ ও একটি এটিআর৭২-২১২ ছাড়া বাকি সব উড়োজাহাজই উড্ডয়ন অনুপযোগী বলে জানা যায়। এয়ারবাস-এ৩১০-৩২৫ উড়োজাহাজটি দিয়ে আন্তর্জাতিক ও এটিআর৭২-২১২ দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইট কোনো রকমে চালু রেখেছে।

 

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের বহরে থাকা পাঁচটি এমডি-৮৩ উড়োজাহাজের সবই যান্ত্রিক ত্রুটিতে উড্ডয়ন অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। এয়ারলাইনসটি ২০০৯ সালের ১ জুলাই প্রথম এমডি-৮৩ (রেজিস্ট্রেশন নাম্বার এস২-এইইউ; কনস্ট্রাকশন নাম্বার ৪৯৭৯০) উড়োজাহাজটি কেনে। এটি গত বছরের ৩ জানুয়ারি থেকে উড্ডয়ন অনুপযোগী। বহরের দ্বিতীয় এমডি-৮৩ উড়োজাহাজটি (রেজিস্ট্রেশন নাম্বার এস২-এইএইচ; কনস্ট্রাকশন নাম্বার ৪৯৯৩৭) কেনা হয় ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি। ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর থেকে এটি উড্ডয়ন অনুপযোগী। আর ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর কেনা তৃতীয় এমডি-৮৩ উড়োজাহাজটি (রেজিস্ট্রেশন নাম্বার এস২-এএফভি; কনস্ট্রাকশন নাম্বার ৫৩৩৭৭) ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে উড্ডয়ন অনুপযোগী। এছাড়া ২০১৩ সালে যুক্ত হওয়া বাকি দুটি এমডি-৮৩ উড়োজাহাজের মধ্যে একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি ও অন্যটি বেবিচকের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

এদিকে ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেয়ায় বসে গেছে এয়ারলাইনসটির বহরে থাকা ড্যাশ-৮-১০০ উড়োজাহাজটি। এটি উড্ডয়নক্ষম করতে ইঞ্জিন আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া একটি এটিআর৭২-২১২ উড়োজাহাজ সি-চেকে এবং আরেকটি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পড়ে আছে। গত বছরের ২০ জুলাই কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণের সময় নোজ হুইল আটকে যাওয়ায় রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে উড়োজাহাজটি। এতে প্রায় ২২ ঘণ্টা বন্ধ থাকে কক্সবাজার বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম।

কোম্পানির পক্ষ থেকে অনেক আগে বলা হয়- তারা লন্ডনে যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু লন্ডনে যে রুটে তারা চলছে সেখান থেকে যাত্রী পাওয়া দুষ্কর। প্রায়ই সেখান থেকে এর বিমান খালি কিংবা অল্পকিছু যাত্রী নিয়ে বাংলাদেশে আসে। কারণ লন্ডন থেকে এদেশে আসতে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের গেটউইক রুট ব্যবহার করতে হয়। অথচ অধিকাংশ যাত্রী ব্যবহার করে হিথ্রো রুট। কারণ হিথ্রো রুট ব্যবহার করা এ কোম্পানির অনুমতি নেই। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়া, মূল্য সংবেদশীল তথ্য প্রদানে গড়িমসি ভাব, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একক স্বেচ্ছাচারিতা, গ্রাহক সেবা প্রদানে উদাসীনতা, প্রয়োজনীয় স্থানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকা ইত্যাদি অব্যবস্থাপনা এক সময়ে এ কোম্পানির ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই অচিরেই কোম্পানির উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। জানা গেছে, এ কোম্পানি এ পর্যন্ত দুই বার সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ( বিএসইসি) আইন লঙ্ঘন করেছে। প্রথমত, এ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান একই পদে দন্ডায়মান যা এসইসির ২০০৬ এর জারিকরা নোটিশের ভঙ্গন। দ্বিতীয়ত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য না দিতে অপারগতা যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ সালের ১৫ নং আইন এর ২৫ ধারা লঙ্ঘন। প্রসঙ্গত, এ কোম্পানির সম্প্রতি যেসকল পুরাতন এয়ারক্রাফট কিনেছে তার একটি তথ্যও জানানো হয়নি। অথচ এগুলো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য। তাই রাইট শেয়ার ইস্যূর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কষ্টার্জিত টাকা নেয়ারই আগেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ ব্যাপারে যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

শেয়ারবাজার/ও/তু/সা

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top