উত্থানের বাজারে কারা লেনদেন করেছে? জেনে নিন

dse-cseশেয়ারবাজার রিপোর্ট: ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের ব্যাপক উত্থান ঘটে। সাথে লেনদেনও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। যা ২০১৭ সালের জানুয়ারির মধ্যভাগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে দুই শেয়ারবাজারে ১৮ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়। কেনা ও বেচা উভয়দিক বিবেচনায় নিলে লেনদেন হয়েছে ৩৭ হাজার ৭৭০ কোটি টাকার। এতে ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগ ছিল মোট লেনদেনের প্রায় ৮৪ শতাংশ। সেখানে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল ১৩ শতাংশের কাছাকাছি।

ডিএসইর বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের বাইরে একক গ্রুপ হিসেবে শীর্ষে ছিল বিদেশি বিনিয়োগ, যা শেয়ারবাজারের মোট লেনদেনের ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এক হাজার ৭৬ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা করেন। এর মধ্যে ৬৮১ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয় এবং বিক্রি ৩৯৫ কোটি টাকার। অর্থাৎ বিদেশিরা বিক্রির তুলনায় কিনেছেন বেশি।

লেনদেনে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল নগণ্য। পুরো ডিসেম্বর মাসে লেনদেনে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ব্রোকার ডিলারদের ক্ষেত্রে হার ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ৩ শতাংশের কম। এককভাবে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবির অংশ প্রায় সোয়া ২ শতাংশ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চাপে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও বিনিয়োগ কিছুটা বাড়িয়েছে। তবে তা লেনদেনের ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ।

প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত নভেম্বরে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিতভাবে শেয়ার ক্রয়ের তুলনায় শেয়ার বিক্রি কম ছিল। তবে ডিসেম্বরের চিত্র ছিল পুরো উল্টো। প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা শেয়ার কিনেছে, বিক্রি করেছে তার প্রায় দ্বিগুণ।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আর্থিক খাতের (ব্যাংক, লিজিং ও বীমা কোম্পানি) মালিকানাধীন ৩২ ব্রোকার ডিলার প্রতিষ্ঠানের অংশ ছিল ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্রোকার ডিলার প্রতিষ্ঠান মিলে এ হার সোয়া ২ শতাংশ ছিল। ব্রোকার ডিলার প্রতিষ্ঠান ২১৮ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয় করেছে। বিক্রি করেছে ৪০২ কোটি টাকার শেয়ার।

এর মধ্যে ব্রোকার ডিলার হিসেবে সর্বাধিক ৩৪ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে দ্য সিটি ব্যাংকের মালিকানাধীন সিটি ব্রোকারেজ। বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রিতেও ছিল শীর্ষে। বিক্রি করেছে ৩১ কোটি টাকার শেয়ার। এর পরের অবস্থানে থাকা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ ২৮ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে ২৭ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে। শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউস ৭ কোটি টাকারও কম শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে বিক্রি করেছে ২৩ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের শেয়ার। শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউস লংকাবাংলা ১ কোটি টাকারও কম শেয়ার কিনেছে। বিপরীতে বিক্রি করেছে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকার শেয়ার।

গত ডিসেম্বরের লেনদেনে ৫৬ মার্চেন্ট ব্যাংকের অংশ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২৩৬ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি করেছে ২৭৭ কোটি টাকার শেয়ার। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রায় ২২ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের মার্চেন্ট ব্যাংক অগ্রণী ইক্যুয়িটি। বিপরীতে বিক্রি করেছে ৪৩ কোটি টাকার শেয়ার। ট্রাস্ট ব্যাংকের মালিকানাধীন ট্রাস্ট ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট ১৭ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে প্রায় ২৮ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে।

তবে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মালিকানাধীন মার্চেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট ডিসেম্বরে প্রায় ১১ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ করলেও কোনো শেয়ার বিক্রি করেনি।

ব্যাংকগুলোর মধ্যে এ সময়ে সবচেয়ে সক্রিয় ব্র্যাক, পূবালী, ঢাকা, ইসলামী, এনআরবি কমার্শিয়াল, এনআরবি ব্যাংক। এক সময়কার বিনিয়োগে সর্বাধিক সক্রিয় ন্যাশনাল, এবি, প্রাইম, ট্রাস্ট, সাউথইস্ট, এনসিসি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের নিজস্ব পোর্টফোলিও বিনিয়োগ খুবই কম। সহযোগী কোম্পানির মাধ্যমে অল্প কেনাবেচা করেছে।

এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইসিবি বিনিয়োগে এগিয়ে ছিল। পুরো ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি ৪৫২ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে ৩৯৯ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছিল, যা মোট লেনদেনের সোয়া ২ শতাংশ। নভেম্বরেও প্রতিষ্ঠানটি ৩৬৮ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয় করেছিল। বিক্রি করেছিল ২৯০ কোটি টাকার।

মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বিএমবিএ সভাপতি ছায়েদুর রহমান শেয়ারবাজারনিউজ ডটকমকে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কম হওয়ার কারণ ব্যাংক কোম্পানি আইনে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সেগুলোর সহযোগী মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার ডিলার হিসাবের বিনিয়োগ ব্যাপক হারে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বলতে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের হাত বেঁধে ফেলা হয়েছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।

শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশের শেয়ারবাজারের অনেকটা অপুষ্ট শিশুর মতো বড় হচ্ছে। সুষ্ঠু বিনিয়োগ ধারা সৃষ্টি করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সৃষ্টির জন্য কোনো প্রণোদনা নেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত, লেনদেন ও সূচক কতটা বাড়ল, সেদিকে নজর না দিয়ে বাজারের টেকসই উন্নতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শ্রেণির দিকে নজর দেওয়া।

শেয়ারবাজারনিউজ/আ

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top