আজ: রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ইং, ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১০ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

০৭ অগাস্ট ২০২১, শনিবার |



kidarkar

নিয়ম মানছে না সেন্ট্রাল ফার্মা, অন্ধকারে বিনিয়োগকারীরা

  • মানছে না ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারনের শর্ত
  • নিয়ম ভেঙে লেনদেন করছে ‘বি’ ক্যাটাগরির হয়ে
  • পুঞ্জিভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা
  • ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে কোম্পানির ৩টি ব্যাংক হিসাব
  • বিনিয়োগকারীরা চিন্তিত

শেয়ারবাজার রিপোর্ট: দেশের শেয়ারবাজারকে বিনিয়োগবান্ধব ও স্বচ্ছ করতে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু দু’একটি কোম্পানির অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন একটি কোম্পানি সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। ২০১৩ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি নানা অনিয়মে ভর করে চলছে। এতে বিনিয়োগকারীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি, ক্ষতিরমুখে পড়ছে পুরো শেয়ারবাজার।

জানা গেছে, তালিকাভুক্তির সময় থেকেই কোম্পানিটি বিতর্কে জড়ায়। তখন সেন্ট্রাল ফার্মার প্রসপেক্টাস ইস্যু নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়। তবে অদৃশ্য কারণে শেষ পর্যন্ত সে ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যায়। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে বড় একটি অভিযোগ- আলিফ গ্রুপের সঙ্গে মালিকানা পরিবর্তনের গুজব ছড়িয়ে শেয়ার দরে কারসাজি করা। এছাড়াও অন্যান্য ইস্যুতেও বছর জুড়েই নেতিবাচক আলোচনায় ছিল সেন্ট্রাল ফার্মা। কিন্তু নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি নীতি নির্ধারণী মহল। আবার দিনদিন কোম্পানিটির অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। এতে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত প্রতিটি কোম্পানির পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বিধান থাকলেও সেন্ট্রাল ফার্মা ১০ বছরেও তা করতে পারেনি। বর্তম‍ানে কোম্পানিটির পরিচালকদের হাতে রয়েছে মাত্র ২৫.৮৯ শতাংশ শেয়ার।

বর্তমান ঊর্দ্ধমুখি শেয়ারবাজারে ইতিবাচক লেনদেন করছে প্রায় সব খাতই।  ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলোর প্রায় সবই সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। তবে সেন্ট্রাল ফার্মায় নেই ইতিবাচক প্রবণতা। সর্বশেষ প্রকাশিত তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটি শেয়ার প্রতি লোকসান দেখিয়েছে ০.১০ টাকা।

গেল অর্থবছরে (৩০ জুন ২০২০) লোকসান দেখিয়ে কোম্পানিটি নো ডিভিডেন্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আইন অনুযায়ী কোম্পানিটি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকার কথা থাকলেও ডিএসই’তে লেনদেন করছে ‘বি’ ক্যাটাগরির হয়ে। কোম্পানির লোকসান দেখানো এবং ডিএসইর ভুলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

উল্লেখ্য, সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালসের পুঞ্জিভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

এদিকে কোম্পানিটির ঘুরে দাঁড়ানোর কোন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। সেন্ট্রাল ফার্মার জনতা ব্যাংকের ঢাকা লোকাল অফিসে ৩টি হিসাব রয়েছে। যেগুলো ট্যাক্স অথরিটি লেনদেন অযোগ্য (ফ্রিজ) করে রেখেছে। তাদের দাবিকৃত ৯ কোটি ৩১ লাখ টাকার ট্যাক্সের জন্য ২০১৫ সালে এমনটি করে রেখেছে। তবে এখনো এ বিষয়টির কোন সমাধান বা উন্নতি হয়নি।

এসব বিষয়ে শনিবার (৭ আগস্ট) কথা হয় কোম্পানি সচিব মো. তাজুল ইসলামের সাথে। শেয়ারবাজারনিউজকে তিনি জানান, পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বিষয়ে বোর্ড নতুন করে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। আমরা গত জানুয়ারি মাসের ২৮ তারিখ ৬ মাসের সময় চেয়ে ডিএসইর কাছে আবেদন করেছিলাম। আবেদনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়ে জানিয়ে দেবো।

সেন্ট্রাল ফার্মার জনতা ব্যাংকের ঢাকা লোকাল অফিসে ৩টি হিসাব রয়েছে। যেগুলো ট্যাক্স অথোরিটি লেনদেন অযোগ্য (ফ্রিজ) করে রেখেছে। হিসাবগুলো সচল করতেও কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেও শেয়ারবাজারকে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, প্রতিবছর সেন্ট্রাল ফার্মার আর্থিক প্রতিবেদন উল্টা-পাল্টা করার অভিযোগও কম নয়। কোম্পানিটির নিরীক্ষক খোদ তাদের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছে। নিরীক্ষকের মতে, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৮ কোটি ২২ লাখ টাকার মজুদ পণ্য হিসাব থেকে বাদ (রিটেন অফ) দিয়েছে। ওই পরিমাণ মজুদ পণ্য ধ্বংস করেছে বলে জানিয়েছে। যা আর্থিক হিসাবে বিক্রিত পণ্যের ব্যয় (কস্ট অফ গুডস সোল্ড) হিসাবে দেখিয়েছে। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কোন প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি। এর আগের অর্থবছরের নীরিক্ষায় কোম্পানিটির ক্রয়, উৎপাদন সক্ষমতা, বিক্রিত পণ্যের ব্যয় ও বিক্রির তুলনায় মজুদ পণ্যের পরিমাণ বেশি দেখানো হয়েছিল বলে নিরীক্ষক জানিয়েছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে সেন্ট্রাল ফার্মা কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওনা ৫৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা হিসাব থেকে বাদ দিয়েছে। তবে সাপোর্টিং কোন প্রমাণাদি দিতে পারেনি। কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের দাবি, ওইসব পাওনা টাকা দীর্ঘদিনের, দোকানদার ও মেডিক্যাল অফিসারদের পাওয়া যাচ্ছে না এবং মেয়াদাত্তীর্ণ পণ্য ফেরতের কারনে এমনটি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত হিসাব বা সাপোর্টিং কোন কিছু সরবরাহ করা হয়নি।

বিগত অর্থবছরের (২০১৮-১৯) নিরীক্ষায় পর্যবেক্ষনের কথা উল্লেখ করে নিরীক্ষক জানিয়েছে, প্রতিবছর দেনাদার বেড়েছে। তবে কোন কোন বিক্রিয় কেন্দ্র বা পার্টির কারনে দেনাদার বেড়েছে, তার কোন রিপোর্ট ও নিশ্চয়তার সনদ দেয়নি।

নিরীক্ষক জানিয়েছে, শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড থেকে ৩২ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে বলে আর্থিক হিসাবের নোট ২১-এ উল্লেখ করা হলেও সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস কর্তৃপক্ষ তার কোন প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি। এছাড়া ১৪ কোটি ১ লাখ টাকার নিট বিক্রয়, ৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার কাচাঁমাল ক্রয় এবং ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল ক্রয়ের প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি।

অর্থাৎ সেন্ট্রাল ফার্মায় আসলে হচ্ছে টা কি তা নিয়ে পুরো অন্ধকারে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তাই কোম্পানিটির বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন ভুক্তভোগিরা।

৩ উত্তর “নিয়ম মানছে না সেন্ট্রাল ফার্মা, অন্ধকারে বিনিয়োগকারীরা”

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.