আজ: বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১ইং, ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৪শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

০৯ নভেম্বর ২০২১, মঙ্গলবার |



kidarkar

হাইকোর্টের রুল জারি

আইডিআরএ চেয়ারম্যানের দুর্নীতি -মানিলন্ডারিং তদন্তে দুদক ও বিএফআইইউকে নির্দেশ

আতাউর রহমান: বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. এম মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং এর অভিযোগ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সেই সাথে ৩০ দিনের মধ্যে তথ্য জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

তথ্য মতে, আইডিআরএর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুটি কোম্পানীর নামে ২টি প্রভিডেন্ট ফান্ড ও ২টি গ্রাচুইটি ফান্ড গঠন পূর্বক আইন ও বিধি বহির্ভূতভাবে কোটি কোটি টাকা লেনদেন, দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং এর অভিযোগ রয়েছে। সেই অভিযোগ কেন তদন্ত পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না এবং মোশাররফ হোসেন ও তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়ার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং করার জন্য কেন এফআইআর জারি করা হবে না এই বিষয়ে একটি রুল জারি করে আদালত।

রুলটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, বিএফআইইউর এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর, ডাইরেক্টর জেনারেল অব লেবার ডাইরেক্টরেট অব লেবারের প্রতি ইস্যু করা হয়েছে।

এবং মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত পূর্বক দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটকে ৩০ দিনের মধ্যে জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মোশাররফ হোসেন ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে আইডিআরএর সদস্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।কিন্তু ইতিপূর্বে তিনি গত ৯ মে ২০১৭ সালে “লাভস এন্ড লাইভ অর্গানিকস লিমিটেড (এলএলওএল)” নামে একটি কোম্পানী রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানীতে ইনকর্পোরেট করেন যার ডাইরেক্টর ও ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হিসেবে তিনি নিজে এবং তার স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়াকে ডাইরেক্টর হিসেবে উক্ত কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেন।

এছাড়া গত ২৮ জানুয়ারী ২০১৮ সালে “গুলশান ভ্যালি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (জিভিএআইএল)” নামে আরেকটি কোম্পানী রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানীতে ইনকর্পোরেট করেন যার ডাইরেক্টর ও ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হিসেবে তিনি নিজে এবং তার স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়াকে ডাইরেক্টর হিসেবে উক্ত কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেন।

তথ্য অনুযায়ী, তিনি ঐ কোম্পানী দুটির প্রতিটির নামে একটি করে এমপ্লয়ীজ গ্রাচুইটি ফান্ড ও একটি করে এমপ্লয়ীজ (কন্ট্রিবিউটরি) প্রভিডেন্ট ফান্ড (মোট ৪টি ফান্ড) গঠন করে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করেন।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, মোশাররফ হোসেন নিজেই উল্লিখিত ৪টি ফান্ডের বোর্ড অব ট্রাষ্টির চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত আছেন যা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১০ এর পরিপন্থি। কিন্তু তার ব্যক্তিগত ইনকাম ট্যাক্স ফাইলে নিজেকে ঐ কোম্পানীর ডাইরেক্টর এবং ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হিসেবে ঘোষণা করলেও কোম্পানী কোন ব্যবসা শুরু করে নাই বলে তিনি জানান। অথচ কোম্পানী দুটির নামে ৪টি ফান্ড গঠন করে শেয়ার মার্কেটে ৪ কোটি টাকার উপরে বিনিয়োগ করেছেন। ফান্ডের বিও একাউন্টে তার নাম, ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ও ব্যক্তিগত ই-মেইল এড্রেস ব্যবহার করেছেন। ঐ সকল বিও একাউন্টের ব্যাংক হিসাবগুলো তিনি নিজেই পরিচালনা করেন।

আইডিআরএ চেয়ারম্যানের দাবী অনুযায়ী তার পরিচালনাধীন কোম্পানী দুটি যদি কোন ব্যবসা শুরুই করে না থাকে তাহলে ফান্ডের নামে এতো টাকা কিভাবে বিনিয়োগ হয়েছে এই প্রশ্নে উল্লেখ্য যে, ট্রাষ্ট এ্যাক্ট অনুযায়ী যে কোন ফান্ড থেকে ক্যাপিটাল মার্কেটে সর্বোচ্চ ২৫% বিনিয়োগ সীমা নির্ধারিত রয়েছে। সুতরাং ক্যাপিটাল মার্কেটে ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে মূল ফান্ডের পরিমাণ কমপক্ষে ১২ কোটি টাকা থাকা উচিত, যার মানে কোম্পানী দুটির এমপ্লয়ীজ বাৎসরিক সেলারী কমপক্ষে ১২০ কোটি টাকা থাকা উচিত, সে মোতাবেক ঐ কোম্পানী দুটির বাৎসরিক টার্নওভার হওয়া উচিত ৬০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকা।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ সালে এলএলওএল এমপ্লয়ীজ গ্রাচুইটি ফান্ডের বিও একাউন্টে ১ কোটি টাকার উপরে এবং এলএলওএল এমপ্লয়ীজ (কন্ট্রিবিউটরী) প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিও একাউন্টে ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার উপরে শেয়ার ছিল। গত দুই বছরে এই দুটি পোর্টফলিওর মার্কেট ভ্যালু ছিল ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। এছাড়া এলএলওএল এমপ্লয়ীজ গ্রাচুইটি ফান্ডের ব্যাংক একাউন্টেই গত ১৭ অক্টোবর ২০২১ তারিখ পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। অন্য ব্যাংক একাউন্টেও একই অবস্থা।

অপরদিকে গত সেপ্টেম্বর ২০২১ সালে অপর দুই ফান্ড জিভিএআইএল এমপ্লয়ীজ গ্রাচুইটি ফান্ডের বিও একাউন্টে ৭০ লক্ষ টাকার উপরে এবং জিভিএআইএল এমপ্লয়ীজ (কন্ট্রিবিউটরী) প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিও একাউন্টে ৯৭ লক্ষ টাকার উপরে শেয়ার ছিল। সর্বমোট ৪টি ফান্ডে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ ছিল ৪ কোটি ২০ লক্ষ টাকার উপরে।

এছাড়াও এলিজেবল ইনস্টিটিউট ইনভেস্টর হিসেবে উল্লিখিত ৪টি ফান্ডের বিও একাউন্টের মাধ্যমে ২০১৮ হতে অক্টোবর ২০২১ পর্যন্ত ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী সহ বিভিন্ন কোম্পানীর আইপিওতে বিডের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করা হয়েছে।

এই বিষয়গুলো হাইকোর্টের নজরে এনে একজন বিনিয়োগকারী আবু সালেহ মোহাম্মদ আমিন মেহেদী একটি রীট পিটিশন দায়ের করনে। এতে সোমবার (৮ নভেম্বর) শুনানী শেষে মঙ্গলবার (৯ নভেম্বর) হাইকোর্টের বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানের দ্বৈত বেঞ্চ উপরোক্ত রুল ইস্যু ও নির্দেশনা প্রদান করেন। আবেদনকারীর পক্ষে রীটটি শুনানী করেন ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খান এবং এডভোকেট সুমাইয়া ইফরিত বিনতে আহমেদ।

এ বিষয়ে জানতে শেয়ারবাজার নিউজের পক্ষ থেকে আবু সালেহ মোহাম্মদ আমিন মেহেদীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খানের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।

মুস্তাফিজুর রহমান খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি শেয়ারবাজার নিউজকে বলেন, সালেহ মোহাম্মদ আমিন মেহেদী একজন আইটি স্পেশালিস্ট হিসেবে বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করেন । এছাড়া তিনি একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। এরআগে এ বছরের শুরুর দিকে‌ বা গত বছরের শেষের দিকে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ তুলে, উনি তাদের কাছ থেকে ঘুষ দাবি করে এবং সেই প্রেক্ষিতে বর্তমানে দুদকে একটা তদন্ত এখনো চলছে। যখন এ বিষয়ে পত্রপত্রিকায় সংবাদ আসে তখন সেই ব্যাপার … একটু উদ্বিগ্ন হয় এবং সেই ব্যাপারে কিছু খোঁজখবর নেন। খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারেন মোশাররফ হোসেন চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায়

দুটি কোম্পানি রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানীতে ইনকর্পোরেট করেন যার ডাইরেক্টর ও ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হিসেবে তিনি নিজে এবং তার স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়াকে ডাইরেক্টর হিসেবে রাখা হয়েছে।

কিন্তু আইডিআরএ আইনের ৭নং ধারায় বলা আছে কোনো কোম্পানির সদস্য বা পরিচালক থাকা অবস্থায় আইডিআরএর চেয়ারম্যান বা মেম্বার হতে পারবেন না বলে জানিয়ে তিনি বলেন, সেই মোতাবেক এর আগে এ বিষয়ে আরেকটি রিট পিটিশন দাখিল করা হয়েছে। সে রিটের বিপরীতে হাইকোর্ট রুল জারি করেন যে, তিনি কোন অধিকারবলে চেয়ারম্যান পদে আছে এবং কেন তাকে অপসারণ করা হবে না। এই রুলটি এখনো পেন্ডিং আছে।

তিনি আরো বলেন, এরপর সে আরো কিছু খোঁজখবর নেন। তার মনে প্রশ্ন আসে আইডিআরএর চেয়ারম্যান এমনি এমনি এই কোম্পানি তৈরি করেননি। খোঁজখবর নেয়ার পর জানা যায় কোম্পানিরগুলোর কোনো ব্যবসা নেই, তারা এখনও তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেনি। অথচ এই দুইটা কোম্পানির মোট চারটি ফান্ড রয়েছে। যার ট্রাস্টির চেয়ারম্যান হলেন মোশাররফ হোসেন। যেগুলোর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন তথ্যে যোগাযোগের ঠিকানা, নম্বর , ইমেইল অ্যাড্রেস মোশাররফ হোসেনের দেয়া আছে।

এছাড়া ফান্ডগুলোর ব্যাংক একাউন্টে গত দুই-আড়াই বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। গত ২-৩ বছরে শেয়ার বাজারে প্রায় চার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে ফান্ডগুলো। কিন্তু আয়কর নথি অনুযায়ী কোম্পানির কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই। তাহলে সেই কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কিভাবে দেয়া হয়। ফান্ডের ২৫% যদি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে তাহলে ফান্ডের পরিমাণ হবে ১২ কোটি। তাহলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কত হওয়ার কথা,সেই বেতনই বা কিভাবে দেয়া হয়।

এরআগে বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তাই তিনি হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছেন। তরই প্রেক্ষিতে শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

উল্লেখ্য, এর আগে অন্য একটি রীটে মোশাররফ হোসেন কর্তৃক বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১০ ধারা ৭(৩) (খ) অমান্য করে কর্তৃপক্ষের সদস্য ও চেয়ারম্যান নিযুক্ত হওয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না মর্মে রুল পেন্ডিং রয়েছে। সেই সাথে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১০ এর ১৪(১)(গ) এবং ১৪(২) ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যানকে অপসারণ না করা কেন অবৈধ হবে না মর্মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগের সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব বরাবরে রুল পেন্ডিং রয়েছে।

 

বিস্তারিত আসছে….

২ উত্তর “আইডিআরএ চেয়ারম্যানের দুর্নীতি -মানিলন্ডারিং তদন্তে দুদক ও বিএফআইইউকে নির্দেশ”

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.