আজ: বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২ইং, ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৬ই শাওয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

সর্বশেষ আপডেট:

১০ মার্চ ২০২২, বৃহস্পতিবার |



kidarkar

কুয়াকাটায় জেলিফিশের মৃত্যু নিয়ে এখনি সরকারকে ভাবতে হবে- সেভ আওয়ার সির সিম্পোজিয়ামে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে গত বছর উদ্বেগজনকহারে ডলফিনের মৃতদেহ ভেসে এসেছিল। এবার সেখানে প্রতিদিন ভেসে আসছে হাজারো জেলিফিস। জেলিফিসের সৈকতে ভেসে আসার ঘটনা অস্বাভাবিক না হলেও এখন যে হারে আসছে সেটি অবশ্যই উদ্বেগজনক। এর পেছনে সমুদ্রের আভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা তা অনুসন্ধানে সরকারকে এখনি মনযোগী হতে হবে।

মঙ্গলবার (৮ মার্চ) সন্ধ্যায় কুয়াকাটা পৌরসভার হলরুমে সমুদ্র বিষয়ক পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ আওয়ার সি আয়োজিত সমুদ্র সুরক্ষা ও সুনীল অর্থনীতি শীর্ষক কোস্টাল সিম্পোজিয়ামে বক্তারা এই কথা বলেন।

সেভ আওয়ার সি-এর রিসার্চ ফেলো ও প্রাণপ্রকৃতি সাংবাদিক কেফায়েত শাকিলের সঞ্চালনায় এবং সংগঠনের মহাসচিব মুহাম্মদ আনোয়ারুল হকের সভাপতিত্বে সিম্পোজিয়ামে প্রধান অতিথি ছিলেন, কুয়াকাটা পৌরসভার মেয়র আনোয়ার হোসেন হাওলাদার। আরও বক্তব্য রাখেন ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের পরিদর্শক বদরুল কবীর, মহিপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মনির হোসেন, কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাসির উদ্দিন বিপ্লব, পর্যটন ও পরিবেশকর্মী কে এম বাচ্চু, দৈনিক কালেরকণ্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার শাহাদাৎ শপন প্রমুখ।

ডলফিন রক্ষা কমিটির সদস্য কে এম বাচ্চু বলেন, এই সৈকতে গত বছরে আমরা দেখেছি একে একে ২২টি ডলফিনের মৃতদেহ উঠে এসেছিল। যার অধিকাংশ জেলেদের জালে আটকে মারা গেছে বলে প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন হঠাৎ করে প্রতিদিন হাজার হাজার জেলিফিসের মৃতদেহ আসতে শুরু করেছে। আগেও আসতো কিন্তু এখন যে হারে আসছে তাকে স্বাভাবিক বলার কোনো সুযোগ নেই। দ্রুত এই ঘটনার কারণ খুঁজতে সরকারকে তৎপর হতে হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, এই সৈকতে প্রতিদিন শত শত মোটরসাইকেল চলে। মোটরসাইকেল চাপায় হাজারে কাঁকড়া মারা যায়। সৈকত প্লাস্টিক আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়। সেগুলো আবার সমুদ্রেই যায়। এখানে নিষিদ্ধ মাছ ধরা হয়, বন্যপ্রাণী হত্যা হয়। কিন্তু দেখার কেউ নেই।

কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাসির উদ্দিন বিপ্লব বলেন, কুয়াকাটা দিন দিন অপরিচ্ছন্ন হচ্ছে। এখানে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিচ বাইকের দৌরত্ম বিন্দুমাত্র কমেনি বরং বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বরং উল্টো পুলিশের বাইকও সৈকতে পর্যটক বহন করে। চর বিজয়ে যাও কিছু প্রতিবেশ ছিল সেটাও ধংসের পথে। আমরা মনেকরি দ্রুত এই চর বিজয়ের পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।

জেলি ফিসের মৃত্যু অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এই সৈকতে মৃত জেলিফিস আগেও এসেছে। আমরা সেটা দেখেছি। কিন্তু এবার যে পরিমানে আসছে এটা কোনোভাবে স্বাভাবিক বলা যায় না। অবশ্যই এ নিয়ে সরকারের বিজ্ঞানীদের দিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।

মহিপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মনির হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানান কারণে আমরা কুয়াকাটার মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের সৈকতে ভাঙন সুস্পষ্ট। সৈকতের পাসের বনের গাছ মারা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের কারণেও বন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বনের জমি দখল হচ্ছে, উজাড় হচ্ছে। বিচে চলা বাইকের কারণে বন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমুদ্রের অনেকগুলো প্রাণীও মারা পড়ছে।

তাছাড়া, ডলফিনসহ বিভিন্ন পোনামাছের অকাল মৃত্যু হচ্ছে জেলেদের অসাবধানতার কারণে। তাই সমুদ্র প্রতিবেশ রক্ষায় জেলেসহ সাধারণ মানুষকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সিনিয়র সাংবাদিক শাহাদাৎ শপন বলেন, আমরা গেলো বছর এখানে এসেছি, একটি সার্বে করেছি। তখন মেয়রের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি অনেকগুলো পরিবর্তনের আশ্বাস দিয়েছেন। এবার এসে কুয়াকাটা শহরের কিছুটা পরিবর্তন দেখেছি। কিন্তু সেটাও খুব সামান্য। এবার বিচে টঙ দোকান দেখানি, এই টঙ দোকান থেকে বেশি প্লাস্টিক দূষণ হয় এবং পরিবেশ নষ্ট হয়।

তবে ওয়েস্ট মেনেজমেন্ট সিস্টেম না থাকায় এই শহর ও সৈকত এখনও অপরিচ্ছন্ন থাকে। শহরটি একটি পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে সাজানো দরকার। পর্যটকদের সেবা নিশ্চিতে আরও জোর দেওয়া দরকার। কারণ পর্যটক না এলে কুয়াকাটা আর সাধারণ একটি ইউনিয়নের মধ্যে বিন্দু পরিমানও তফাৎ থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সমুদ্র সচেতনতায় সেভ আওয়ার সি এর কার্যক্রমের প্রসংশা করে ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের পরিদর্শক বদরুল কবীর বলেন, পর্যটন ও জেলেসহ সমুদ্র সম্পৃক্তদের সচেতন করতে এই আয়োজন অনেক বেশি প্রয়োজন। জনগণ প্রাণ-প্রকৃতির বিষয়ে সচেতন থাকলে পুলিশ লাগে না। আর তারা না জানলে পিটিয়েও খুব একটা কাজ হয় না।

সমুদ্র প্রতিবেশ রক্ষায় পর্যটকদের বাধ্য করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ শক্ত অবস্থানে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে সেভ আওয়ার সি এর মহাসচিব মু. আনোয়ারুল হক বলেন, কুয়াকাটার সৈকতের জীববৈচিত্র্য রক্ষা না করলে এখানকার পর্যটন ও মৎস্য সম্পদ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সৈকতের লাল কাঁকড়ার কারণ এখানে আসতে উৎসাহিত হন পর্যটকরা। এরা মারা গেলে পর্যটক এসে কি দেখবেন? একইভাবে সমুদ্র মাছ উৎপাদন হলে সেটি ধরে জীবিকা নির্বাহ করবেন জেলেরা। কিন্তু সমুদ্র দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণে মৎস্য সম্পদ কমে গেলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে জেলার। যদিও আমরা কেউই সেটা দেখি না। গবেষণা বলছে, প্রতিদিন বিচ বাইকের চাপায় অন্তত ৬ হাজার কাঁকড়ার মৃত্যু হয়। জেলেরাও অপ্রয়োজনীয় অনেক পোনামাছ ও সামুদ্রিক প্রাণী ধরে এনে নষ্ট করে। এভাবেই প্রতিনিয়ত হুমকিতে পড়ছে আমাদের সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য।

তিনি বলেন, এই সৈকতে সম্প্রদি একের পর এক জেলিফিস মরে আসছে। আমরা জানি মাঝে মাঝে জেলিফিস ডাঙায় এসে আটকা পড়ে মারা যায়। কিন্তু এত বেশি সংখ্যক হারে মৃত্যু আগে দেখিনি। তাছাড়া, আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি সৈকতে আসার আগেই এগুলো মরে আসছে। কয়েকদিন ধরেই আমরা দাবি করছি, এই মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করা হবো। তাছাড়া, ইকোলজিক্যাল ব্যালেঞ্চ থাকলে মরলেও এরা সৈকতে আসতো না। সৈকতে এত সংখ্যায় আসা বলে দিচ্ছে এখানে প্রতিবেশ ভেঙে পড়েছে। সরকারের উচিত জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে সমুদ্রের কোনো মড়ক পড়েছে কিনা সেটা নিয়ে গবেষণা করা।

একইসঙ্গে কুয়াকাটায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়া, বিচে যানবাহন নিষিদ্ধকরণ, চরগুলোতে পর্যটক নিয়ন্ত্রণ ও ম্যানগ্রোভ বনায়নের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন সেভ আওয়ার সি এর মহাসচিব।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কুয়াকাটা পৌরসভার মেয়র বলেন, কুয়াকাটায় আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন সড়কব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে ট্যুরিস্ট আরও বেশি আসবে। এসব মাথায় রেখেই আমরা শহরের উন্নয়ন করছি। আমরা চাচ্ছি এখানে টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। কিন্তু দুঃখজন বিষয় হল বিচের কোনো নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই। আমি চাইলেও ওখানকার কিছু পরিবর্তন করতে পারবো না। বিচ থেকে টঙ দোকান সরিয়ে দিলে সেইসব দোকানদারদের পরিবার কিভাবে চলবে সেটাওতো ভাবতে হবে। এসব ভেবে আমরা চেষ্টা করছি পৌরসভায় একটি মার্কেট করতে। বিচে বাইক চলার অন্যতম কারণ রাস্তা না থাকা। সেই রাস্তা করাও আমার আওতাধীন কাজ নয়, তাই কিছু বলার নেই।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী কুয়াকাটাকে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছেন সেটা সুস্পষ্ঠ। প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহকে মূল্যায়ণ করতে আমরা এই শহরকে টেকসই ও সুন্দর একটি শহরে রূপ দেওয়ার কাজ করছি। কিন্তু আমাদের এখানে হাইপ্রোফাইল ট্যুরিস্ট আসেন না বিমানবন্দর না থাকায়। যার কারণে এখনো কুয়াকাটা সেভাবে সেজে উঠেনি। আমি অনুরোধ করবো এবং আহ্বান জানাবো অতিদ্রুত এখানে একটি বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাহলে কুয়াকাটার পর্যটন ঘুরে দাঁড়াবে।

আপনার মতামত দিন

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.