মন্দায় ধুকছে ফান্ড:ডিভিডেন্ডে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

mutualfundশেয়ারবাজার রিপোর্ট: গত তিন মাসে পুঁজিবাজারে সূচকের ব্যাপক পতনের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থায় অধিকাংশ মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মুনাফা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। এর প্রভাবে এই ফান্ডগুলোর ডিভিডেন্ড কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানুয়ারি’১৫ থেকে মার্চ’১৫ পর্যন্ত প্রকাশিত অনিরীক্ষিত প্রান্তিক প্রতিবেদন থেকে এ তিন মাসে ফান্ডগুলোর মুনাফার চিত্র পাওয়া গেছে।

প্রসঙ্গত, ১ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে ডিএসই’র ব্রড ইনডেক্স ছিল ৪৯৪১.১৫ পয়েন্টে। ৩০ মার্চ ২০১৫ পর্যন্ত এই সূচক ৪৩২.২৩ পয়েন্ট কমে ৪৫০৯.২৮ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। গত এক মাসে অর্থাৎ মার্চ থেকে এপ্রিলের ৩০ তারিখ পর্যন্ত সূচক আরো ৪৬২ পয়েন্ট কমে বর্তমানে ৪০৪৭.২৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে। দেখা যাচ্ছে গত ৪মাসের ব্যাবধানে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স সর্বমোট ৮৯৪.২৩ পয়েন্ট কমেছে। এই সময়ে বাজারের লেনদেনেও ভাটা নেমেছে। এদিকে সিএসই এর সাধারণ সূচক জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এই তিন মাসে ৭৬৪.৩৩ পয়েন্ট কমেছে। আর গত চার মাসে অর্থাৎ এপ্রিল ৩০ তারিখ পর্যন্ত সিএসই’র সাধারণ সূচক  ১৬১৬.৭ পয়েন্ট কমেছে। সিএসই’র সাধারণ সূচক বর্তমানে ৭৫৪৮.৯৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

এরই ধারাবাহিকতায় আলোচিত তিন মাসের অনিরীক্ষিত প্রান্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ২৯টি তালিকাভুক্ত মিউচ্যুয়াল ফান্ড। এর মধ্যে ৬২ শতাংশ অর্থাৎ ১৮টি ফান্ডের মুনাফা কমেছে। অপরদিকে ৩৮ শতাংশ অর্থাৎ ১১টি ফান্ডের মুনাফা এ তিন মাসে বেড়েছে।

এর মধ্যে সম্পদ ব্যবস্থাপক এলআর গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত ফান্ডগুলোর মুনাফার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এলআর গ্লোবাল পরিচালিত ৬টি ফান্ডের মধ্যে ৫টিই গত তিন মাসে ব্যাপক লোকসান দিয়েছে।

এর পরেই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব আইসিবি’র সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লি: (আইসিবিএএমসিএল)। এ কোম্পানি দ্বারা পরিচালিত তিনটি ফান্ডের মুনাফা গত তিনমাসে কমেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি পরিচালিত ৮টি ফান্ডের মধ্যে গত তিন মাসে মাত্র ২টি ফান্ডের মুনাফা বেড়েছে। অপরদিকে বাকি ৬টি ফান্ডেরই মুনাফা কমেছে।

সবচেয়ে ভাল অবস্থানে রয়েছে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লি:। তাদের দ্বারা পরিচালিত ১০টি ফান্ডের মধ্যে ৮টি ফান্ডের মুনাফা এ তিন মাসে বেড়েছে। অপরদিকে কমেছে ২টি ফান্ডের মুনাফা।

ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত ২টি ফান্ডের মুনাফা গত তিন মাসে বেড়েছে।

এলআর গ্লোবাল: আলোচিত ফান্ড ৬টি হলো:

ডিবিএইচ১ম মিউচ্যুয়াল ফান্ড জানুয়ারি’১৫ থেকে মার্চ’১৫ পর্যন্ত লোকসান দিয়েছে ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অথচ এর আগের বছর একই সময়ে ফান্ডটির মুনাফা ছিল ৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০১৩-২০১৪ হিসাব বছরের জন্য ফান্ডটি ইউনিটহোল্ডারদের ০.৬০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল।

গ্রীণডেল্টা মিউচ্যুয়াল ফান্ড আলোচিত তিন মাসে ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। অথচ এর আগের বছর একই সময়ে ফান্ডটি ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা আয় করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে লোকসানে চলে যাওয়ায় ফান্ডটি ২০১৩-২০১৪ হিসাব বছরে কোন ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি।

এলআরগ্লোবাল মিউচ্যুয়াল ফান্ড ওয়ান আলোচিত তিন মাসে ১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। অথচ এর আগের বছর একই সময়ে ফান্ডটি ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা আয় করেছিল। ২০১৩-২০১৪ হিসাব বছরের জন্য ফান্ডটি ইউনিটহোল্ডারদের ৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল।

এনসিসিব্যাংক মিউচ্যুয়াল ফান্ড ওয়ান আলোচিত তিন মাসে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। অথচ এর আগের বছর একই সময়ে ফান্ডটি ৪ কোটি ৮ লাখ টাকা আয় করেছিল।

শুধুমাত্র এআইবিএল১ম মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মুনাফা আলোচিত তিন মাসে বেড়েছে। এই সময়ে ফান্ডটির মুনাফা হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে ফান্ডটির মুনাফা হয়েছিল ১ কোটি ৯ লাখ টাকা। কিন্তু ফান্ডটি এর আগের দুই প্রান্তিকে লোকসান দেখিয়েছিল।

আইসিবিএএমসিএল: আলোচিত তিন মাসে এই সম্পদ ব্যবস্থাপক দ্বারা পরিচালিত আইসিবি ২য় এনআরবি, আইসিবিএএমসিএল২য় মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং আইসিবি এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড এই তিনটি ফান্ডের সম্মিলিত মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৭ শতাংশ কমেছে। এই তিন ফান্ড সম্মিলিতভাবে আলোচিত তিন মাসে ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। এর আগের বছর একই সময়ে সম্মিলিতভাবে এই মুনাফা ছিল ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

আইসিবি: আলোচিত তিন মাসে এই প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত আটটি ফান্ডের মধ্যে মাত্র ২টি ফান্ডের মুনাফা বেড়েছে অপরদিকে বাকি ৬টি ফান্ডের মুনাফা কমেছে।

প্রথম আইসিবি ফান্ডটি এ তিন মাসে মুনাফা করেছে ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে এই মুনাফা ছিল ১ কোটি ২ লাখ টাকা। গত বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমেছে ৮৫ শতাংশ।

২য় আইসিবি মিউচ্যুয়াল ফান্ডটি এ তিন মাসে মুনাফা করেছে ২০ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে এই মুনাফা ছিল ৩৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। গত বছরের ব্যাবধানে মুনাফা কমেছে ৪১ শতাংশ।

৩য় আইসিবি মিউচ্যুয়াল ফান্ডটি এ তিন মাসে মুনাফা করেছে ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে এই মুনাফা ছিল ৪৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা। গত বছরের ব্যাবধানে মুনাফা কমেছে ৫৭ শতাংশ।

৬ষ্ঠ আইসিবি মিউচ্যুয়াল ফান্ডটি এ তিন মাসে মুনাফা করেছে ৩২ লাখ টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে এই মুনাফা ছিল ৭৯ লাখ ১০ হাজার টাকা। গত বছরের ব্যাবধানে মুনাফা কমেছে ৬০ শতাংশ।

৭ম আইসিবি মিউচ্যুয়াল ফান্ডটি এ তিন মাসে মুনাফা করেছে ২৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে এই মুনাফা ছিল ৬২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। গত বছরের ব্যাবধানে মুনাফা কমেছে ৫৬ শতাংশ।

৮ম আইসিবি মিউচ্যুয়াল ফান্ডটি এ তিন মাসে মুনাফা করেছে ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে এই মুনাফা ছিল ৯০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গত বছরের ব্যাবধানে মুনাফা কমেছে ৩২ শতাংশ।

রেস এএমসিএল: এই সম্পদ ব্যবস্থাপক দ্বারা পরিচালিত ১০টি ফান্ডের মধ্যে ২টি ফান্ডের মুনাফা আলোচিত তিন মাসে কমেছে। অপরদিকে ৮টি ফান্ডের মুনাফা মন্দাবস্থার মাঝেও বেড়েছে।

মুনাফা কমেছে এক্সিম ব্যাংক১ম মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং ইবিএলএনআরবি মিউচ্যুয়াল ফান্ড। এই ফান্ডদ্বয়ের মুনাফা এ তিন মাসে হয়েছে যথাক্রমে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে এই মুনাফা ছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

এ প্রসঙ্গে প্রাইম ফাইন্যান্স এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন আল কাশেম শেয়ারবাজারনিউজ ডট কমকে বলেন, বাজারের টানা পতনের কারণে সূচকের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর উদ্বেগজনক হারে কমছে। আর মেয়াদি ফান্ডগুলোকে সর্বাবস্থায় বিনিয়োগযোগ্য অর্থের ৬০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হয়। এমন অবস্থায় ফান্ডগুলো দূরাবস্থার মধ্যে পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। আর এ কারণেই মুনাফা কমছে।

এদিকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বর্তমান দূরাবস্থার বিষয়ে আইসিবিএএমসিএলের পরিচালক আলাউদ্দিন খান বলেন, বর্তমান বাজারের মন্দাবস্থার কারণে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোও দূরাবস্থার মধ্যে পড়েছে। এর থেকে বেরোতে হলে বাজারকে প্রথমে ইতিবাচক ধারায় নিয়ে আসতে হবে। তাছাড়া আকারের দিক দিয়ে পুঁজিবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের অবদান অনেক কম। এতোসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কিভাবে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে এগিয়ে নেওয়া যায় সেই বিষয়ে আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করছি।

এই বিষয়ে বাজারের মন্দাভাবের পাশাপাশি সম্পদ ব্যবস্থাপকের অদক্ষতাকে দায়ী করে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ড. আবু আহমেদ শেয়ারবাজারনিউজ-কে বলেন, বাজারের মন্দাবস্থার মধ্যেও কিছু সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি ভাল কাজ করছে। কিন্তু অধিকাংশই অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার কারণে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছে না। কিন্তু এই অদক্ষতার ভার বিনিয়োগকারীদেরকেই বহন করতে হচ্ছে। এমনিতে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমছে। যার প্রভাব আমরা এশিয়ান টাইগারের সাবস্ক্রিপশনের সময় দেখেছি। আর এ অবস্থা সৃষ্টির পেছনে অদক্ষ সম্পদ ব্যবস্থপকেরাই দায়ী। তাই এসব ব্যবস্থাপকদের চিহ্নিত করে এদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

 

শেয়ারবাজারনিউজ/তু

 

আপনার মন্তব্য

*

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Top